
দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ, দুদকের মামলার পরেও ঢাকা জেলা এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী পদে আবারও ফিরলেন বাচ্চু মিয়া।
ঢাকা জেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. বাচ্চু মিয়াকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে একের পর এক দুর্নীতি, অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠছে। সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থ আত্মসাৎ, টেন্ডার বাণিজ্য, স্বজনপ্রীতি এবং ঠিকাদারদের কাছ থেকে ঘুষ দাবির মতো অভিযোগ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
এই অভিযোগগুলোর মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) মামলা দায়ের করলেও বাচ্চু মিয়া এখনও ঢাকা জেলা এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী পদে বহাল থেকে দায়িত্ব পালন করছেন।
প্রথম আলোচিত অভিযোগটি আসে রাজধানীর গাবতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবন নির্মাণ প্রকল্পকে ঘিরে। অভিযোগ অনুযায়ী, ভবনের নির্ধারিত নির্মাণকাজ সম্পূর্ণ না করেই ঠিকাদারের মাধ্যমে সরকারি অর্থ উত্তোলন করা হয়। গাবতলী প্রকল্পের অভিযোগ প্রকাশের পর ঢাকার নবাবগঞ্জসহ অন্যান্য উন্নয়ন প্রকল্পেও অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসে।
অভিযোগের ভিত্তিতে দুদক এলজিইডির ঢাকা জেলা কার্যালয়ে অভিযান চালিয়ে তদন্ত পরিচালনা করে। তদন্তে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়ার পর গাবতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রকল্পে চারজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়, যার মধ্যে নির্বাহী প্রকৌশলী বাচ্চু মিয়ার নামও অন্তর্ভুক্ত ছিল। তদন্তে দেখা যায়, ঠিকাদারের মাধ্যমে সরকারি ১ কোটি ২২ লাখ ১৯ হাজার ৬০৮ টাকা অবৈধভাবে উত্তোলন করা হয়েছে।
একই সূত্র জানায়, কিছু প্রকল্পে নির্মাণকাজ সম্পূর্ণ না করেই বিল অনুমোদন করা হয়েছে এবং প্রকল্প ব্যয় অতিরিক্ত দেখানোর মতো অনিয়মও ধরা পড়েছে। এছাড়া স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার নাম ভাঙিয়ে ঠিকাদারদের কাছ থেকে ৪০ লাখ টাকা ঘুষ দাবি করার অভিযোগও ওঠে। এ বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে গেলে এক সাংবাদিকের ওপর আনসার সদস্য দিয়ে হামলার ঘটনাও ঘটে। উপদেষ্টার নাম ব্যবহার করে ঘুষ দাবির এই ঘটনার খবর প্রচারের পর তা ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করে।
অভিযোগ রয়েছে, সরকারি কাজ পাইয়ে দেওয়া বা টেন্ডারে সুবিধা দেওয়ার বিনিময়ে ঠিকাদারদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ দাবি করা হতো। একই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতির অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, তার ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের নামে ঠিকাদারি লাইসেন্স করিয়ে সরকারি কাজ পাইয়ে দেওয়া হয়েছে। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে কাজ সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন না করেই বিল উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে আত্মীয়ের প্রতিষ্ঠানের নামে অফিস ভবন রক্ষণাবেক্ষণের একটি প্রকল্পে প্রায় ৪৮ লাখ টাকার বিল উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়াও তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির আরও বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে বলে জানা গেছে।
এলজিইডির অভ্যন্তরীণ সূত্র জানায়, নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে বাচ্চু মিয়া ব্যক্তিগত প্রভাব খাটিয়ে অফিস পরিচালনা করতেন। অভিযোগ রয়েছে, তিনি নিয়মিত অফিসে উপস্থিত না থেকেও গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রভাব রাখতেন এবং ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের মাধ্যমে অফিসের কার্যক্রম পরিচালনা করতেন। এতে অনেক কর্মকর্তা ও কর্মচারী চাপের মুখে পড়েছেন বলেও জানা যায়।
গাবতলী প্রকল্পে অনিয়মের মামলার পরও বাচ্চু মিয়া দীর্ঘদিন নির্বাহী প্রকৌশলী পদে বহাল ছিলেন। পরবর্তীতে সদর দপ্তর থেকে তার বদলির নির্দেশ দেওয়া হলেও তিনি বিভিন্ন প্রভাব খাটিয়ে সেই বদলি কার্যকর হতে দেননি বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে তাকে সদর দপ্তরে স্বপদে সরিয়ে নেওয়া হলেও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর আবারও তাকে ঢাকা জেলা এলজিইডিতে একই পদে দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়। এই ঘটনায় প্রশাসনিক মহলে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে আরও একটি বিতর্ক সামনে আসে। বেসরকারি টেলিভিশন এসএটিভির সাংবাদিক হাসান আল সাকিব বাচ্চু মিয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতির সংবাদ প্রচার করায় তাকে হোয়াটসঅ্যাপে ফোন করে গুম ও হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় সাংবাদিক সাকিব মিরপুর মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন।
সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ ছাড়াও বিভিন্ন অনিয়মের বিষয়টি এখনও আলোচনায় রয়েছে। সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, অভিযোগগুলো দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। তাদের মতে, অভিযোগগুলোর সত্যতা প্রমাণিত হলে সরকারি উন্নয়ন কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
অনেকে মনে করছেন, দুদকে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পর তার বিরুদ্ধে মামলা হলেও অদৃশ্য কারণে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তাদের অভিযোগ, প্রভাবশালী মহলের সমর্থন ও রাজনৈতিক ছত্রছায়ার কারণে তিনি এসব অভিযোগের তোয়াক্কা করছেন না এবং তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।
একাধিক অভিযোগ এবং দুর্নীতির প্রমাণ সামনে আসার পরও তিনি কীভাবে এখনও একই পদে বহাল রয়েছেন-এ নিয়েও বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে।
এ বিষয়ে দুদকের একজন দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছেন, গাবতলী প্রকল্পসহ এলজিইডির অন্যান্য উন্নয়ন কাজের অভিযোগ পাওয়ার পরই তদন্ত করা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাইয়ের ভিত্তিতে মামলা দায়ের করা হয়েছে। তদন্তে নতুন কোনো তথ্য পাওয়া গেলে পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অন্যদিকে, এলজিইডির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) জানান, কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তা খতিয়ে দেখে। অনিয়ম বা দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব।
এ বিষয়ে বাচ্চু মিয়ার সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে অভ্যন্তরীণ সূত্র জানিয়েছে, তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো নিয়ে বিভিন্ন সময়ে প্রশাসনিক মহলে আলোচনা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হলে অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত অত্যন্ত জরুরি।
আপনার মতামত লিখুন :