
‘সুশৃঙ্খল, সুরক্ষিত মহাসড়ক’- এই লক্ষ্য সামনে রেখে মহাসড়কে শৃঙ্খলা বজায় রাখা, দুর্ঘটনা প্রতিরোধ, চাঁদাবাজি ও হয়রানি বন্ধ এবং যাত্রী ও চালকদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করার কথা বাংলাদেশ হাইওয়ে পুলিশের। তবে ময়মনসিংহ-নেত্রকোনা মহাসড়কের পূর্বধলা থানাধীন শ্যামগঞ্জ হাইওয়ে থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. আমিনুল ইসলামের বিরুদ্ধে উঠেছে এর বিপরীত কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার গুরুতর অভিযোগ।
এলাকাবাসী ও বিভিন্ন যানবাহনের চালকদের অভিযোগ, শ্যামগঞ্জ হাইওয়ে থানায় দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই মহাসড়কে প্রকাশ্যে চাঁদাবাজি এবং চালকদের কাছ থেকে নিয়মিত মাসোহারা আদায় করা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, গাড়ির কাগজপত্র ঠিক থাকলেও মামলা দেওয়ার ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করা হয়।
কাগজপত্র ঠিক থাকলেও ‘মাসের টাকা’!
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক চালক জানান, গাড়ির বৈধ কাগজপত্র ও চালকের লাইসেন্স থাকার পরও টাকা না দিলে মিথ্যা মামলায় জড়ানোর ভয় দেখানো হয়। আর যেসব গাড়ির কাগজপত্রের মেয়াদ শেষ কিংবা কোনো ধরনের ত্রুটি রয়েছে, সেসব গাড়ির মালিক ও চালকদের সঙ্গে মাসিক ভিত্তিতে ‘মাসোহারা’ নির্ধারণ করা হয় বলেও অভিযোগ করেন তারা।
চালকদের দাবি, ওসি আমিনুল ইসলাম তাদের সরাসরি বলেছেন, তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে, গাড়ির নম্বর দিয়ে যেতে এবং প্রতি মাসের নির্ধারিত টাকা বিকাশ বা নগদ নম্বরে পাঠাতে।
ভুক্তভোগীদের দাবি, ওসির ব্যক্তিগত কিংবা তাঁর ঘনিষ্ঠদের ব্যবহৃত মোবাইল ব্যাংকিং নম্বরগুলোর লেনদেন যাচাই করা হলে কথিত মাসোহারা আদায়ের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে। তাদের অভিযোগ, এসব লেনদেনে বিপুল পরিমাণ অর্থের হিসাব মিলতে পারে।
রেকার না থাকলেও ‘রেকার বিল’!
শ্যামগঞ্জ হাইওয়ে থানায় নিজস্ব রেকার না থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন সময় যানবাহন আটকে ‘রেকার বিল’ আদায়ের অভিযোগও করেছেন চালকেরা।
তাদের অভিযোগ, গাড়ি আটকের পর রেকার বিল এবং মামলার ভয় দেখিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে হয়রানি এড়াতে চালকেরা বাধ্য হয়ে সেই টাকা পরিশোধ করেন বলেও দাবি তাদের।
যেসব যানবাহন থেকে মাসোহারা নেওয়ার অভিযোগ
বিভিন্ন যানবাহনের চালকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বালুবাহী গাড়ি, সিএনজি, বিভিন্ন বেকারির গাড়ি, রড-সিমেন্টবাহী যান, সারবাহী গাড়ি এবং ভাঙারি বহনকারী গাড়ি থেকে নিয়মিত মাসোহারা নেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
চালকদের ভাষ্য, নির্ধারিত টাকা দেওয়ার বিনিময়ে তারা মামলা ও বিভিন্ন ধরনের হয়রানি থেকে রেহাই পাওয়ার চেষ্টা করেন।
রাজনৈতিক প্রভাবের ভয় দেখানোর অভিযোগ
ওসি আমিনুল ইসলাম নিজেকে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী হিসেবে দাবি করে চালক ও স্থানীয়দের ভয়ভীতি দেখান বলেও অভিযোগ করেছেন কয়েকজন ভুক্তভোগী।
এ ছাড়া তাঁর বাড়ি কিশোরগঞ্জ জেলায় হলেও নরসিংদী জেলা শহরে একটি ছয়তলা বাড়িসহ নামে-বেনামে বিপুল সম্পদ রয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।
শুক্রবার শ্যামগঞ্জ বাজারে যানজট, ওসির অনুপস্থিতির অভিযোগ
ঐতিহ্যবাহী শ্যামগঞ্জ বাজারে প্রতি শুক্রবার সাপ্তাহিক হাট বসে। এদিন বাজার ও আশপাশের মহাসড়কে অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ তৈরি হয়ে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয় বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
তাদের দাবি, মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখার দায়িত্ব হাইওয়ে পুলিশের হলেও ওসি আমিনুল ইসলাম প্রতি শুক্রবার কর্মস্থল ত্যাগ করে বাড়ি চলে যান এবং রোববার এসে দায়িত্বে যোগ দেন। ফলে হাটের দিন যানজট নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় চালক ও সাধারণ মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে হয় বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ওসি আমিনুল ইসলামের দ্রুত প্রত্যাহার এবং তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
অভিযোগ ‘সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন’ দাবি ওসির
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে শ্যামগঞ্জ হাইওয়ে থানার ওসি মো. আমিনুল ইসলামের মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও অসত্য বলে দাবি করেন।
এ সময় ৬৫ জনের একটি তালিকায় যাদের কাছ থেকে সম্মিলিতভাবে মাসোহারা নেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে, সেই তালিকা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি এ বিষয়ে কোনো বক্তব্য দেননি।
অভিযোগ প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা: অতিরিক্ত আইজিপি
ওসি আমিনুল ইসলামের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও মাসোহারা আদায়ের অভিযোগের বিষয়ে হাইওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি ফারুক আহমেদের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই মহাসড়ককে চাঁদাবাজিমুক্ত করতে তিনি ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করেছেন।
তিনি বলেন, যাদের বিরুদ্ধে অপরাধের প্রমাণ পাওয়া গেছে, তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
শ্যামগঞ্জ হাইওয়ে থানার ওসি আমিনুল ইসলামের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ প্রসঙ্গে ফারুক আহমেদ বলেন, অভিযোগগুলোর সুনির্দিষ্ট সত্যতা পাওয়া গেলে দ্রুত প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
শ্যামগঞ্জ হাইওয়ে থানার ওসির বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে কতটা প্রমাণিত হয়, এখন সেটিই দেখার বিষয়।
প্রতিবেদনে উল্লিখিত অভিযোগগুলো সংশ্লিষ্ট চালক, স্থানীয় বাসিন্দা ও অভিযোগকারীদের বক্তব্যের ভিত্তিতে প্রকাশ করা হয়েছে। অভিযোগ অস্বীকার করেছেন শ্যামগঞ্জ হাইওয়ে থানার ওসি মো. আমিনুল ইসলাম।
আপনার মতামত লিখুন :