
দিনাজপুরের প্রত্যন্ত এলাকার একটি টিনের ঘর। নেই পড়ার আলাদা টেবিল, নেই স্বচ্ছলতার নিশ্চয়তা। কখনো বিছানায়, কখনো মায়ের সেলাই মেশিনের ওপর বই রেখে পড়তে হয়েছে সাদিয়া আফরিনকে। অথচ সীমাবদ্ধতাকে পেছনে ফেলে এবারের এসএসসি পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ অর্জন করেছে এই শিক্ষার্থী।
সাদিয়ার এই সাফল্যের গল্পে আছে একটু ভিন্ন ধরনের সহযোগিতার ঘটনা। পড়াশোনার খরচ চালাতে না পারায় একসময় জেলা প্রশাসকের কাছে আর্থিক সহায়তা চেয়েছিল তার পরিবার। কিন্তু জেলা প্রশাসক মো. রফিকুল ইসলাম শুধু অর্থ দিয়ে সমস্যার সমাধান করতে চাননি। বরং সাদিয়াকে দিয়েছিলেন পড়াশোনার একটি কঠিন চ্যালেঞ্জ – প্রতি সপ্তাহের নির্ধারিত পড়া শেষ করে তাঁর কাছে এসে তা বুঝিয়ে দিতে হবে।
সেই শুরু। সপ্তাহ পেরিয়ে মাস, মাস পেরিয়ে এক বছর। নিয়ম করে প্রতি বুধবার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে গিয়ে নিজের পড়া বুঝিয়ে দিয়েছে সাদিয়া। আর প্রতিবারই নতুন করে পেয়েছে পরবর্তী সপ্তাহের পড়ার নির্দেশনা।
গত ১০ আগস্ট এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর দেখা যায়, সাদিয়ার নামের পাশে জিপিএ-৫। নিজের স্কুল থেকেও সে হয়েছে একমাত্র জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থী।
আর্থিক সহায়তা চেয়ে ডিসির দ্বারস্থ মা
দিনাজপুর সদর উপজেলার মাসিমপুর সরকারপাড়া এলাকার বাসিন্দা সাদিয়া আফরিন। স্থানীয় কাদের বকস মেমোরিয়াল হাই স্কুল থেকে এবারের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয় সে।
সাদিয়ার বাবা মো. সেলিম একটি চালকলে শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। মা আরফা বেগম সংসারের কাজ সামলানোর পাশাপাশি সেলাইয়ের কাজ করেন। তিন মেয়ের মধ্যে সাদিয়া সবার বড়।
সংসারের সীমিত আয়ে সন্তানদের পড়াশোনার খরচ চালানো কঠিন হয়ে পড়লে গত বছরের জুলাইয়ে মেয়ের বইসহ শিক্ষাসামগ্রীর জন্য আর্থিক সহায়তা চেয়ে জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করেন আরফা বেগম।
আবেদনের পর মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে জেলা প্রশাসকের সঙ্গে দেখা করেন তিনি। সেদিন জেলা প্রশাসক সাদিয়ার পড়াশোনা, পরিবার ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন করেন। কিন্তু বেশ কিছু প্রশ্নের উত্তর ঠিকভাবে দিতে পারেনি সাদিয়া।
তখনই যেন বদলে যায় গল্পের গতিপথ।
টাকা নয়, প্রথমে দিলেন পড়ার চ্যালেঞ্জ
প্রথম সাক্ষাতে জেলা প্রশাসক রফিকুল ইসলাম সাদিয়াকে তাৎক্ষণিকভাবে আর্থিক সহায়তা না দিয়ে সাত দিনের পড়া ঠিক করে দেন। পাশাপাশি তৈরি করে দেন প্রতিদিনের পড়াশোনার সময়সূচি।
নির্দেশনা ছিল – রাতে দুই ঘণ্টা এবং ভোরে দুই ঘণ্টা পড়তে হবে। রাত ১০টার মধ্যে ঘুমাতে হবে, ভোর ৫টায় উঠতে হবে। বিকেলে এক ঘণ্টা খেলাধুলার জন্য সময় রাখতে হবে। স্কুলে ক্লাস থাকুক বা না থাকুক, প্রতিদিন বিদ্যালয়ে যেতে হবে।
আর সপ্তাহের পড়া শেষ করে প্রতি বুধবার সকালে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে গিয়ে তা বুঝিয়ে দিতে হবে।
রুটিন ঠিকভাবে অনুসরণ করতে পারলে চার মাস পর আর্থিক সহায়তা দেওয়ার কথাও জানান জেলা প্রশাসক। তবে চার মাস অপেক্ষা করতে হয়নি; পরের মাসেই সাদিয়াকে দেওয়া হয় ৭ হাজার টাকা।
বুধবার হয়ে ওঠে সাদিয়ার ‘দ্বিতীয় স্কুল’
এরপর প্রায় নিয়মিতই বুধবারে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে হাজির হতে শুরু করে সাদিয়া।
সপ্তাহজুড়ে যে পড়াগুলো করার কথা, সেগুলো শেষ করে সে নিয়ে আসত খাতা-বই। জেলা প্রশাসক মানুষের বিভিন্ন অভিযোগ শুনতে গণশুনানিতে ব্যস্ত থাকলেও সময় বের করে সাদিয়ার পড়া শুনতেন। কোথাও ভুল হলে সংশোধন করে দিতেন। এরপর হাতে তুলে দিতেন পরের সপ্তাহের পড়া।
এভাবেই জেলা প্রশাসকের কার্যালয়টি ধীরে ধীরে সাদিয়ার কাছে হয়ে ওঠে আরেকটি শিক্ষার জায়গা।
জেলা প্রশাসক রফিকুল ইসলাম বলেন, প্রথম দিন সাদিয়ার সঙ্গে কথা বলেই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, মেয়েটির পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ রয়েছে। তাই তাকে একটি চ্যালেঞ্জ দেওয়া হয়েছিল। সাদিয়া সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে নিয়মিত হোমওয়ার্ক করেছে।
ঘরে পড়ার টেবিলও ছিল না
সাদিয়ার সাফল্যের পেছনের গল্পটি আরও কঠিন।
গত ১৫ আগস্ট মাসিমপুর সরকারপাড়া এলাকায় তাদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে যাওয়ার জন্য আলাদা কোনো সড়ক নেই। অন্যের লিচুবাগানের ভেতর দিয়ে সরু পথ পেরিয়ে পৌঁছাতে হয় টিনের ছাপরার বাড়িটিতে।
মাত্র দুই শতক জমির ওপর বাড়িটি। ঘরের মাঝখানে বেড়া দিয়ে দুই ভাগ করা। এক অংশে থাকেন সাদিয়ার বাবা-মা ও ছোট বোন। অন্য অংশে সাদিয়া ও তার মেঝ বোনের থাকার ব্যবস্থা।
ঘরে নেই পড়ার জন্য আলাদা টেবিল। আলমারির ওপর সাজিয়ে রাখা সাদিয়ার বইপত্র। কখনো বিছানায়, কখনো মায়ের সেলাই মেশিনের ওপর বই রেখে পড়তে হয়েছে তাকে।
ঘরের পাশে ছোট রান্নাঘর। টিনের চালের ফাঁকে লতাপাতার মধ্যে ঝুলছে চালকুমড়া।
এমন পরিবেশেই নিজের স্বপ্নকে বড় করেছে সাদিয়া।
স্কুলে ৪৩ জনের মধ্যে জিপিএ-৫ একমাত্র সাদিয়ার
কাদের বকস মেমোরিয়াল হাই স্কুল থেকে এবারের এসএসসি পরীক্ষায় ৪৩ জন শিক্ষার্থী অংশ নেয়। তাদের মধ্যে পাস করেছে ২২ জন। আর পুরো বিদ্যালয়ের মধ্যে জিপিএ-৫ পেয়েছে শুধু সাদিয়া আফরিন।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মকসেদ আলী বলেন, সাদিয়ার এই ফলাফলে তারা অত্যন্ত আনন্দিত। জেলা প্রশাসক রফিকুল ইসলাম বিভিন্ন সময় বিদ্যালয়ে গিয়ে ক্লাস নিতেন এবং সাদিয়াকে নিজের মেয়ের মতো দেখতেন ও পড়াতেন।
ফল প্রকাশের পর আবার ডিসির কাছে সাদিয়া
গত ১০ আগস্ট ফল প্রকাশের পর সাদিয়ার পরিবারে নেমে আসে আনন্দ। জিপিএ-৫ পাওয়ার খবর জানার পর মা-বাবার আনন্দের যেন শেষ নেই।
এরপর গত বৃহস্পতিবার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে যায় সাদিয়া। সেখানে জেলা প্রশাসক তাকে অভিনন্দন জানান এবং মিষ্টিমুখ করান।
সাদিয়া জানায়, প্রথমদিকে জেলা প্রশাসকের কাছে গিয়ে পড়া দিতে ভয় লাগত। তবে সে নিয়মিত পড়া তৈরি করত। জেলা প্রশাসকের কাছ থেকে পাওয়া আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি তাঁর উৎসাহ ও সাহসও তাকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে।
শুধু সাদিয়া নয়, আরও অনেক শিক্ষার্থীকে সহায়তার উদ্যোগ
জেলা প্রশাসক রফিকুল ইসলাম মনে করেন, সাদিয়ার মতো আরও অনেক শিক্ষার্থী রয়েছে, যারা মেধাবী হলেও প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণের অভাবে পিছিয়ে পড়ছে।
তিনি জানান, গত দেড় বছরে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কয়েকজন মেধাবী শিক্ষার্থীকে শিক্ষা সহায়তা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি প্রতিবছর নির্দিষ্টসংখ্যক শিক্ষার্থীকে বৃত্তি দেওয়ার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
সরকারি চাকরিতে যেতে চায় সাদিয়া
সাদিয়ার স্বপ্ন এখন আরও বড়। পড়াশোনা শেষ করে সরকারি চাকরিতে যোগ দিতে চায় সে। নিজের পরিবারের অভাব দূর করে মা-বাবার পাশে দাঁড়াতে চায়।
মেয়ের সাফল্যে খুশি বাবা মো. সেলিম। তবে আনন্দের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তাও আছে তাঁর। কারণ মেয়েকে আরও অনেক দূর পড়াতে হবে, আর সীমিত আয়ের সংসারে সেই খরচ বহন করা সহজ নয়।
সেলিম বলেন, জেলা প্রশাসক তাঁর মেয়ের নিয়মিত খোঁজ নিয়েছেন এবং সহযোগিতা করেছেন। মেয়ে অনেক দূর পড়তে চায়, কিন্তু তাঁরা কতদূর পর্যন্ত মেয়ের পড়াশোনার খরচ চালাতে পারবেন-সেটিই এখন তাঁর চিন্তা।
অভাবের ঘরে বেড়ে ওঠা সাদিয়ার হাতে তাই এখন নতুন স্বপ্ন। আর সেই স্বপ্নের পথে জেলা প্রশাসকের দেওয়া এক বছরের নিয়মিত পড়ার চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে তার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ এক অধ্যায়।
আপনার মতামত লিখুন :