
লেখকঃ মোহাম্মদ অলিদ বিন সিদ্দিক তালুকদার, সভাপতি ফ্যাসিবাদ প্রতিরোধ আন্দোলন
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (UNGA) ৮১তম অধিবেশনে যোগদান উপলক্ষে নিউইয়র্ক সফরকে কেন্দ্র করে প্রকাশিত বিভিন্ন ছবি ও সফরসঙ্গীদের তালিকা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীর পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তিদের পরিচয় ও তাঁদের সফরসঙ্গী হিসেবে অন্তর্ভুক্তি নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে।
অনেকের প্রশ্ন-প্রধানমন্ত্রীর পেছনে দাঁড়ানো এরা কারা? তাঁরা কি জনপ্রতিনিধি? দলের দুঃসময়ের ত্যাগী নেতারা কোথায়?
সফরসঙ্গীদের বহরে ৩৫ নয়, ৪০ জন রয়েছেন। এ নিয়ে মাহদীরা মিথ্যা ও অসত্য গল্পের হাটবাজার ছড়িয়ে দিয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে মূল প্রশ্ন হলো-এত বড় একটি বহরের মধ্যে বিএনপির দুর্দিনের ত্যাগী নেতাদের কেউ কি রয়েছেন? যদি কারও চোখে পড়ে থাকেন, জানাবেন। আমার চোখের চশমায় তাঁদের ধরা পড়েনি।
তবে সবকিছুর মূলে প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী নির্বাচনের স্টাইলটি আমার পছন্দ হয়েছে।
রাজনৈতিক নেতাদের মাঠে রাখাই কি বেশি কার্যকর?
আমার পর্যবেক্ষণ হলো, রাজনৈতিক নেতা বা জনপ্রতিনিধিদের সবসময় প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী না করে তাঁদের মাঠে রাখাই উত্তম। কারণ কখন দেশের কী পরিস্থিতি হয়, তা বলা যায় না। দেশের যেকোনো সংকটময় পরিস্থিতিতে সাধারণত জনপ্রতিনিধিরাই জেল-জুলুমের শিকার হন, রাজপথে থাকেন এবং দলের নেতাকর্মীদের পাশে দাঁড়ান। অন্যদিকে অনেকেই তখন ধান্দায় থাকেন কিংবা হারিয়ে যান।
প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ সফরে দাপ্তরিক কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের থাকা প্রয়োজন-এটি স্বাভাবিক। কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতায় দলের মাঠপর্যায়ের নেতাদের ভূমিকা আলাদা।
প্রধানমন্ত্রীর পেছনে দাঁড়ানো ব্যক্তিদের মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশকে বাংলাদেশের মানুষ চেনে না, জানেও না-এমন আলোচনা দেখা যাচ্ছে। আরও মজার বিষয় হলো, তাঁদের প্রায় ৯০ শতাংশই শেখ হাসিনার আমলে জেল-জুলুমের শিকার হননি-এমন দাবিও উঠেছে।
প্রশ্ন হলো, এটাই কি নতুন বাংলাদেশ হ কাঙ্ক্ষিত চিত্র?
ত্যাগের মূল্যায়ন কোথায়?
দেশের জন্য আপনারা জীবন বাজি রেখেছেন, কোনো রাজনৈতিক দলের জন্য নয়-এই নীতিই মানতে হবে। এর বিনিময়ে কিছু চাওয়াও উচিত নয়। কারণ দেশের প্রয়োজনে আপনারাই যখন-তখন বাংলাদেশকে রক্ষা করবেন, আর রাজনৈতিক দলগুলো ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠার পর ক্ষমতায় গিয়ে দেশ পরিচালনা করবে-এটাই স্বাভাবিক রাজনৈতিক বাস্তবতা।
জনসম্পৃক্ততা ধরে রাখার প্রয়োজন থেকেই হয়তো প্রধানমন্ত্রী তাঁর সঙ্গে কিছু নতুন মুখ বা তুলনামূলকভাবে অপরিচিত ব্যক্তিকে রাখছেন, যাতে তাঁর দাপ্তরিক ও অন্যান্য কাজে সুবিধা হয়। সাধারণত বাংলাদেশের বড় প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের সঙ্গে থাকা অনেক স্টাফকেই সাধারণ মানুষ চেনেন না। সে হিসেবে প্রধানমন্ত্রীও হয়তো তাঁর প্রয়োজনীয় টিমকেই সঙ্গে রেখেছেন।
প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী টিমে যারা
প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী টিমে রয়েছেন-
ড. জুবাইদা রহমান – ফার্স্ট স্পাউস
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী – অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী
ড. খলিলুর রহমান – পররাষ্ট্রমন্ত্রী
এম. রশিদুজ্জামান মিল্লাত – বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী
মো. আসাদুজ্জামান – আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়কমন্ত্রী
রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর – উপদেষ্টা, অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়
হুমায়ুন কবির – প্রতিমন্ত্রী-১, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়
শামা ওবায়েদ ইসলাম – প্রতিমন্ত্রী-২, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়
মো. আমিনুল হক – প্রতিমন্ত্রী, যুব ও ক্রীড়া
ববি হাজ্জাজ – প্রতিমন্ত্রী, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা
মাহদী আমিন – উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র
রেহান আসিফ আসাদ – উপদেষ্টা (প্রতিমন্ত্রী), ডাক ও টেলিযোগাযোগ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন – চেয়ারম্যান, ইনভেস্ট বাংলাদেশ অথরিটি
তানভীর শাহরিয়ার গনি – বিশেষ সহকারী (প্রতিমন্ত্রী), বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজার
এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার – বিশেষ সহকারী (প্রতিমন্ত্রী), স্বাস্থ্য
ড. মো. সাইমুম পারভেজ – বিশেষ সহকারী (সচিব), পরিবেশ ও জলবায়ু
মো. মেহেদুল ইসলাম – একান্ত সচিব-২, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়
আব্দুর রহমান সানি – সহকারী একান্ত সচিব-২
লে. কর্নেল মো. জুন্নুন নাহিদ – সহকারী সামরিক সচিব
ড. শাহ মুহাম্মদ আমান উল্লাহ – সিনিয়র মেডিকেল অফিসার
মো. উজ্জ্বল হোসেন – প্রটোকল অফিসার-১
কামরুল ইসলাম – প্রটোকল অফিসার-২
লে. কমান্ডার মো. সোহানুর রহমান – এডিসি
আবু আব্দুল্লাহ এম সালেহ- প্রেস সচিব
আতিকুর রহমান রুমন – অতিরিক্ত প্রেস সচিব
মো. নাজমুল হক খান – সহকারী প্রেস সচিব
আসাদ আলম সিয়াম – পররাষ্ট্র সচিব
ড. মো. নজরুল ইসলাম – সচিব, পূর্ব ও পশ্চিম
সালাহউদ্দিন নোমান চৌধুরী – সচিব, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়
এ.এফ.এম. জাহিদ-উল-ইসলা – চিফ অব প্রটোকল
মো. কামরুজ্জামান – মহাপরিচালক (জাতিসংঘ)
মো.তৌফিক-উর-রহমান – মহাপরিচালক (মিয়ানমার)
আইরিন খান – রাষ্ট্রদূত, জাতিসংঘে স্থায়ী মিশন, নিউইয়র্ক
তারেক মো. আরিফুল ইসলাম – রাষ্ট্রদূত, ওয়াশিংটন ডিসি
রুমি এ. হোসেন – চেয়ারম্যান, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স
জহরাত আদিব চৌধুরী – সভাপতি, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি
সাইফুল হক – সাধারণ সম্পাদক, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি
সৈয়দ গোলাম মহিউদ্দিন – সাধারণ সম্পাদক, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম
মেজর জেনারেল মাহবুবুস সামাদ চৌধুরী – মহাপরিচালক, এসএসএফ
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল গোলাম আরিগুল আলম – কমান্ডার, পিজিআর
তবে উপরের তালিকায় থাকা কয়েকজন তাঁদের নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রের কারণে বর্তমানে নিউইয়র্কে অবস্থান করছেন বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
ত্যাগী নেতাদের জন্য জায়গা কি ছিল না?
সবশেষে একটি প্রশ্ন থেকেই যায়-মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে দলের ত্যাগী নেতাদের মূল্যায়নের সময় আর কবে আসবে?
উক্ত বহরের সঙ্গে দলের মধ্য থেকে সিনিয়র পর্যায়ের দু-চারজন ত্যাগী নেতাকে অন্তর্ভুক্ত করা কি সম্ভব ছিল না?
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর দলের অনেক ত্যাগী ও শীর্ষ পর্যায়ের নেতাকর্মী এখনও যথাযথ মূল্যায়ন পাননি-এমন অভিযোগ রয়েছে। রাজনৈতিক সংকট বা বিপদের সময়ে যাঁরা দলের পাশে ছিলেন, তাঁদের মূল্যায়নের বিষয়টি তাই গুরুত্বপূর্ণ।
আমার আশঙ্কা, যখন বড় ধরনের বিপদ আসবে, তখন সুবিধাবাদী বা হাইব্রিড হিসেবে পরিচিত এসব লোকের অনেকেই হয়তো বিপদের মুখে দলের নেতাকর্মীদের পাশে থাকবেন না। তখন উদ্ধার করতে এগিয়ে আসবেন দলের সেই ত্যাগী নেতাকর্মীরাই, যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে রাজপথে ছিলেন এবং নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও দলকে টিকিয়ে রেখেছেন।
সবকিছু মিলিয়ে দলের ভেতরে ঘাপটি মেরে থাকা এবং সময়ের সঙ্গে রং-জার্সি বদলানো ‘হাইব্রিড’ ও সুবিধাবাদী সংস্কৃতির যে আবির্ভাব দেখা যাচ্ছে, তা নিয়ে উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ রয়েছে। অন্তত বর্তমান চিত্র দেখে আমি ভালো কোনো আলামত দেখতে পাচ্ছি না।
দলের জন্য যারা ত্যাগ স্বীকার করেছেন, তাঁদের মূল্যায়ন করা এবং একই সঙ্গে প্রশাসনিক ও দাপ্তরিক প্রয়োজনের সঙ্গে রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য রাখা-ভবিষ্যতের জন্য সেটিই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
আপনার মতামত লিখুন :