Tathyojora.news ত্যাগী নেতারা উপেক্ষিত, সুবিধাবাদীরা পুরস্কৃত-বিএনপির ভবিষ্যৎ কোন পথে? - Tathyojora.news

ত্যাগী নেতারা উপেক্ষিত, সুবিধাবাদীরা পুরস্কৃত-বিএনপির ভবিষ্যৎ কোন পথে?


তথ্যজোড়া ডেস্ক অক্টোবর ২৭, ২০২৬, ১:২২ AM
ত্যাগী নেতারা উপেক্ষিত, সুবিধাবাদীরা পুরস্কৃত-বিএনপির ভবিষ্যৎ কোন পথে?

লেখক: মোহাম্মদ অলিদ সিদ্দিক তালুকদার

সভাপতি – ফ্যাসিবাদ প্রতিরোধ আন্দোলন 

বিএনপির ভবিষ্যৎ নিয়ে কেন যেন বারবার মনে প্রশ্ন জাগছে। দলের রাজনৈতিক গতিপথ কি সঠিক পথে এগোচ্ছে? ত্যাগী নেতাদের যথাযথ মূল্যায়ন হচ্ছে কি? নাকি দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামে পরীক্ষিত নেতাদের আড়ালে ঠেলে দিয়ে সুবিধাবাদী ও অনুপ্রবেশকারীদের প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে? সাম্প্রতিক কিছু রাজনৈতিক বাস্তবতা এসব প্রশ্নকে আরও সামনে নিয়ে এসেছে।

বিএনপির দুর্দিনের কান্ডারি, নব্বইয়ের দশকের সংগ্রামী ছাত্রনেতা, ডাকসুর সাবেক এজিএস, সাবেক সংসদ সদস্য ও বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা নাজিমউদ্দীন আলমের মতো নেতারা দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের সাক্ষী। ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের আমলে রাজপথের আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ হয়ে শরীরে বুলেটের ক্ষত বহন করার অভিজ্ঞতা তাঁর রাজনৈতিক ত্যাগের স্মারক। সরকারবিরোধী আন্দোলনে সামনের সারিতে থাকা এবং তারেক রহমানকে দেশে ফিরিয়ে আনার দাবিতে যারা জীবন বাজি রেখে লড়েছেন, তাঁদের অবদান অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামে যাঁরা ঝুঁকি নিয়েছেন, তাঁদের যথাযথ মূল্যায়ন কোথায়?

বুলেটের ক্ষত বনাম সুবিধাবাদের রাজনীতি

রাজনীতিতে ত্যাগের মূল্যায়ন শুধু কথায় নয়, কাজেও প্রতিফলিত হওয়া জরুরি। যাঁরা দুঃসময়ে দলের পাশে থেকেছেন, মামলা-হামলা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, তাঁদের অবদানকে গুরুত্ব দেওয়া একটি রাজনৈতিক দলের নৈতিক দায়িত্ব।

অন্যদিকে, দীর্ঘ রাজনৈতিক সংকটের সময় যাঁদের সক্রিয় ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে, তাঁরা যদি পরবর্তী সময়ে গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ-সুবিধা ও রাজনৈতিক স্বীকৃতি পান, তাহলে ত্যাগী নেতাকর্মীদের মনে হতাশা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।

সরকারি সফরে কারা সঙ্গী হচ্ছেন, কারা গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরিসরে সুযোগ পাচ্ছেন এবং কারা নেতৃত্বের কাছাকাছি থাকছেন-এসব বিষয় দলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। তবে কাউকে সুবিধাবাদী বা দলীয় স্বার্থবিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করার আগে তাঁর ভূমিকা ও সংশ্লিষ্ট অভিযোগের সত্যতা যাচাই করাও জরুরি।

তৃণমূলের হতাশা কি নেতৃত্বের কাছে পৌঁছাচ্ছে?

একটি রাজনৈতিক দলের শক্তির মূল উৎস তার তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। দুঃসময়ে যাঁরা দলকে আঁকড়ে ধরে রাখেন, তাঁদের অবদান উপেক্ষিত হলে সাংগঠনিক মনোবলে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

দীর্ঘ ১৭ বছরের রাজনৈতিক লড়াইয়ের অভিজ্ঞতা বিএনপির জন্য গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। এই সময়ে দলের নেতাকর্মীরা নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েছেন। তাঁদের ত্যাগ, সাহস ও সাংগঠনিক ভূমিকা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের পক্ষপাতের অভিযোগ উঠলে নেতৃত্বের উচিত তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা।

প্রশ্ন হলো, দল কি দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত নেতাদের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাচ্ছে, নাকি ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতা ও আনুগত্যের ভিত্তিতে সুযোগ বণ্টনের অভিযোগকে প্রশ্রয় দিচ্ছে? এই প্রশ্নের উত্তর শুধু নেতৃত্বের বক্তব্যে নয়, তাদের সিদ্ধান্ত ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডেও স্পষ্ট হওয়া দরকার।

অনুপ্রবেশ ও হাইব্রিড রাজনীতির ঝুঁকি

রাজনৈতিক দল বড় হলে নতুন মানুষ যুক্ত হবেন, নতুন নেতৃত্ব তৈরি হবে-এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু নতুনদের অন্তর্ভুক্তি এবং সুযোগ দেওয়ার প্রক্রিয়ায় যদি আদর্শ, যোগ্যতা, অতীত ভূমিকা ও সাংগঠনিক নিষ্ঠার পরিবর্তে ব্যক্তিগত সম্পর্ক প্রাধান্য পায়, তাহলে দলীয় শৃঙ্খলা দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

বিএনপির মতো দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামে অংশ নেওয়া একটি দলের জন্য এ বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। দলের দুঃসময়ে যাঁরা পাশে ছিলেন, তাঁদের অবমূল্যায়নের অভিযোগ এবং নতুন করে যুক্ত হওয়া ব্যক্তিদের দ্রুত প্রাধান্য পাওয়ার প্রবণতা-দুটিই নেতৃত্বের আত্মসমালোচনার বিষয় হওয়া উচিত।

কারণ, রাজনীতিতে সুযোগের বণ্টন শুধু ব্যক্তির অবস্থান নির্ধারণ করে না; এটি ভবিষ্যৎ কর্মীদের জন্যও দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।

তারেক রহমানের নেতৃত্বের সামনে চ্যালেঞ্জ

তারেক রহমানের নেতৃত্বকে ঘিরে বিএনপির নেতাকর্মীদের প্রত্যাশা অনেক। সেই প্রত্যাশা পূরণে দলের সাংগঠনিক ঐক্য, যোগ্য নেতৃত্বের বিকাশ এবং ত্যাগী নেতাকর্মীদের যথাযথ মূল্যায়ন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

কিন্তু দলের ভেতরে যদি সুবিধাবাদী গোষ্ঠীর প্রভাব বাড়ে, ত্যাগী নেতারা নিজেদের উপেক্ষিত মনে করেন এবং সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্নের সৃষ্টি হয়, তাহলে ভবিষ্যতে নেতৃত্বের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে।

এখানেই আমার উদ্বেগ। কখনো কখনো মনে হয়, বিএনপির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পথচলার লক্ষণগুলো কি অমাবস্যার রাতের মতো ঘন অন্ধকারের দিকে এগোচ্ছে? তারেক রহমানের নেতৃত্বের সামনে কি এমন কোনো সংকট তৈরি হচ্ছে, যার পূর্বাভাস এখনই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার?

এটি কোনো অনিবার্য পরিণতির ঘোষণা নয়; বরং দলের বর্তমান রাজনৈতিক গতিপথ নিয়ে একজন রাজনৈতিক কর্মী ও পর্যবেক্ষকের উদ্বেগ।

বিএনপিকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে

রাজনীতিতে ত্যাগের স্বীকৃতি এবং যোগ্যতার ভিত্তিতে নেতৃত্ব নির্বাচন-দুটিই অপরিহার্য। শুধু অতীতের অবদানের ভিত্তিতে নয়, বর্তমানের কর্মদক্ষতা, সততা, সাংগঠনিক নিষ্ঠা ও জনসম্পৃক্ততার ভিত্তিতেও নেতাদের মূল্যায়ন করতে হবে।

একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত নেতাদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে হবে এবং নতুন নেতৃত্বের বিকাশের সুযোগও নিশ্চিত করতে হবে। দলীয় সিদ্ধান্তে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি থাকলে ত্যাগী নেতাদের মধ্যে অবমূল্যায়নের অনুভূতি কমবে এবং সংগঠনের প্রতি আস্থা বাড়বে।

নাজিমউদ্দীন আলমের মতো নেতারা শুধু ব্যক্তি নন; তাঁরা বিএনপির রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি অধ্যায়ের প্রতিনিধিত্ব করেন। তাঁদের অবদান মূল্যায়নের অর্থ দলের অতীত আন্দোলন-সংগ্রামকেও সম্মান জানানো।

আজ বিএনপির নেতৃত্বের সামনে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন-দল কি ত্যাগ, যোগ্যতা ও আদর্শকে প্রাধান্য দেবে, নাকি ব্যক্তিগত আনুগত্য ও সুবিধাবাদের অভিযোগে বিতর্কিত হবে?

এই প্রশ্নের উত্তরই আগামী দিনের সাংগঠনিক সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক শক্তিকে প্রভাবিত করবে। কারণ, ত্যাগের মূল্যায়ন না থাকলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আন্দোলন-সংগ্রামের প্রেরণা দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।

বিএনপির এখনই আত্মসমালোচনার সময়। ত্যাগী নেতাদের সম্মান জানানো, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা এবং যোগ্যতার ভিত্তিতে নেতৃত্বকে মূল্যায়ন করাই হতে পারে ভবিষ্যতের সংকট মোকাবিলার অন্যতম পথ। অন্যথায়, আজকের অবমূল্যায়নের অভিযোগ আগামী দিনের বড় রাজনৈতিক দুর্বলতায় পরিণত হতে পারে।