
সাইবার অপরাধ, অনলাইন প্রতারণা, তথ্য চুরি, হ্যাকিং, ম্যালওয়্যার, সাইবার হয়রানি ও শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তার মতো বাস্তব হুমকি মোকাবিলায় কার্যকর ও শক্তিশালী সাইবার আইন প্রয়োজন। তবে অপরাধ দমনের নামে নাগরিকের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক ভিন্নমত দমন করা যাবে না বলে মন্তব্য করেছে আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি)।
মঙ্গলবার (০৬ অক্টোবর) সকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবের তোফাজ্জল হোসাইন মানিক মিয়া অডিটোরিয়ামে এবি পার্টি লইয়ার্স আয়োজিত ‘প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা আইন: নিরাপত্তা বনাম হেনস্তা’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন।
সভায় সভাপতিত্ব করেন এবি পার্টির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার যোবায়ের আহমেদ ভূইয়া। সঞ্চালনা করেন ব্যারিস্টার আব্বাস ইসলাম খান নোমান। স্বাগত বক্তব্য দেন দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আব্দুল্লাহ আল মামুন রানা। প্রধান অতিথি ছিলেন এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ।
‘সাইবার আইনের নামে নাগরিকের কণ্ঠ রোধ মেনে নেওয়া হবে না’
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেওয়ার কারণে গৃহিণী থেকে শুরু করে শিক্ষার্থী ও শিক্ষক পর্যন্ত অনেককে গ্রেপ্তার হতে হয়েছে।
গাজীপুরে একজন শিক্ষার্থীকে একটি কথিত ‘ভূতুড়ে বিল’ সংক্রান্ত বক্তব্যের কারণে গ্রেপ্তারের ঘটনাও উল্লেখ করেন তিনি। ফুয়াদ বলেন, ওই শিক্ষার্থীর বক্তব্যের সঙ্গে তারা একমত নন। একই ধরনের ঘটনার কথা উল্লেখ করে তিনি সালমান মুক্তাদিরের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন এবং বলেন, তার স্টুডিও ভাঙচুর করা হয়েছে।
ফুয়াদ বলেন, “সালমানকে সাইজ করার টুল হাতে নেই, তাই এসব সাইবার আইন করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে”-এমন ধারণা যেন মানুষের মধ্যে তৈরি না হয়।
তিনি প্রশ্ন করেন, সাধারণ নাগরিকরা বিএনপির সমালোচনা করতে পারবেন কি না? সন্ত্রাসকে সন্ত্রাস বললে তাদের বিরুদ্ধে মানহানির অভিযোগ হবে কি না? ‘পুলিশ আসামি ছেড়ে দিয়েছে’- এ কথা বললেও কি পুলিশের মানহানি হবে?
এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক বলেন, এমন কোনো আইন করা যাবে না, যেখানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ইমোজি, রাজনৈতিক সমালোচনা কিংবা সরকারের কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তোলাকেও সাইবার অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ থাকে।
তার ভাষ্য, আগের সরকার ডিজিটাল আইন নিয়ে যে ভুল করেছিল, বর্তমান সরকারও যেন একই পথে না হাঁটে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রণীত সাইবার অধ্যাদেশে যেসব ইতিবাচক বিষয় ছিল, সেগুলো বাদ দিয়ে কেন আবার কাটাছেঁড়া করা হচ্ছে, সরকারকে তার ব্যাখ্যা দিতে হবে।
ফুয়াদ আরও বলেন, “গুম-খুনের বিরুদ্ধে কথা বলার লোক ছিল না। আমরা চাই আপনারা সফল হন। কিন্তু আপনারা আওয়ামী লীগ হতে পারবেন না, সেই সক্ষমতা আপনাদের নেই।”
‘প্রস্তাবিত আইন রাষ্ট্রকে আরও কর্তৃত্ববাদী করার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক নকীব মোহাম্মদ নসরুল্লাহ বলেন, ২০২৬ সালের প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা আইনটি ২০১৮ সালের আইন, ২০২৫ সালের অধ্যাদেশ এবং পরবর্তী সংশোধনীর ধারাবাহিকতার সর্বশেষ সংস্করণ।
তার মতে, প্রস্তাবনায় ভুল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এবং এর মাধ্যমে রাষ্ট্রের ক্ষমতা আরও কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
তিনি বলেন, প্রস্তাবিত সংশোধনীগুলো এমনভাবে করা উচিত নয়, যাতে তা পূর্ববর্তী ফ্যাসিস্ট সরকারের আইন ও চর্চার ধারাবাহিকতা হিসেবে বিবেচিত হয়।
‘সাইবার অপরাধী ও সরকারের সমালোচক এক ব্যক্তি নন’
স্বাগত বক্তব্যে অ্যাডভোকেট আব্দুল্লাহ আল মামুন রানা বলেন, বাংলাদেশে একটি শক্তিশালী সাইবার সিকিউরিটি আইন প্রয়োজন। হ্যাকিং, ফাইন্যান্সিয়াল ফ্রড, আইডেন্টিটি থেফট এবং ক্রিটিক্যাল ইনফ্রাস্ট্রাকচারের ওপর সাইবার হামলার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রকে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
তবে তিনি প্রশ্ন রাখেন, সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে নাগরিকের স্বাধীনতাকে অনিরাপদ করে তোলা হবে কি না।
তিনি বলেন, “একজন Cyber Criminal এবং একজন সরকারের সমালোচক এক ব্যক্তি নন। Cyber Criminal-এর বিরুদ্ধে কঠোরতা প্রয়োজন, কিন্তু রাজনৈতিক ভিন্নমতকে Cyber Crime বানানো যাবে না।”
সাম্প্রতিক **Cyber Protection (Amendment) Act, 2026 (CPA2)**-এর খসড়া নিয়ে TIB, ICNLসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের উদ্বেগের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এসব উদ্বেগ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। জনগণের মতামতের জন্য মাত্র ১০ দিন সময় যথেষ্ট নয়। আইন চূড়ান্ত করার আগে আরও সময় দিয়ে অর্থবহ জনপরামর্শ করতে হবে।
রানা বলেন, ‘misinformation’, ‘rumour’ এবং বিশেষ করে ‘derogatory to the State’-এর মতো অস্পষ্ট শব্দের ভিত্তিতে অনলাইন কনটেন্ট বন্ধ বা সরানোর ক্ষমতা অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
কোনো ওয়েবসাইট বা কনটেন্ট বন্ধ বা সরানোর ক্ষেত্রে স্বাধীন বিচারিক তদারকি নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, জরুরি পরিস্থিতিতে সাময়িক ব্যবস্থা নেওয়া হলেও দ্রুত বিচারিক পর্যালোচনা, লিখিত কারণ, নির্দিষ্ট সময়সীমা এবং আপিলের সুযোগ থাকতে হবে।
বাংলাদেশ ICCPR-এর রাষ্ট্রপক্ষ উল্লেখ করে তিনি বলেন, মতপ্রকাশ ও তথ্যের অধিকার সুরক্ষিত রাখতে যেকোনো বিধিনিষেধ হতে হবে আইনসম্মত, প্রয়োজনীয় ও আনুপাতিক।
তার মতে, বিশ্বের আধুনিক সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থা মূলত critical infrastructure, data protection, risk management এবং cyber resilience-এর ওপর গুরুত্ব দেয়। বাংলাদেশকেও সেই পথেই এগোতে হবে।
সরকারের প্রতি এবি পার্টির পাঁচ আহ্বান
সাইবার আইন নিয়ে সরকারের প্রতি পাঁচটি আহ্বান জানান অ্যাডভোকেট আব্দুল্লাহ আল মামুন রানা।
১. আইন চূড়ান্ত করার আগে ব্যাপক ও অর্থবহ জনপরামর্শ করতে হবে।
২. ‘গুজব’, ‘ভুল তথ্য’ ও ‘রাষ্ট্রবিরোধী’- এ ধরনের অস্পষ্ট শব্দের অপব্যবহার বন্ধ করতে হবে।
৩. কনটেন্ট বন্ধ বা সরানোর ক্ষেত্রে আদালতের অনুমোদন ও কার্যকর বিচারিক পর্যালোচনা নিশ্চিত করতে হবে।
৪. সরকারের সমালোচনা, ভিন্নমত, সাংবাদিকতা ও জনস্বার্থে তথ্য প্রকাশকে সাইবার অপরাধ করা যাবে না।
৫. নাগরিকের ডিজিটাল অধিকার রক্ষায় স্বাধীন তদারকি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
রানা বলেন, “আমরা এমন Cyber Security Law চাই, যা অপরাধীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করবে, কিন্তু নাগরিকের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রকে সীমাহীন ক্ষমতা দেবে না। আমরা রাষ্ট্রের নিরাপত্তা চাই, কিন্তু মতপ্রকাশের স্বাধীনতার বিনিময়ে নয়।”
সাংবাদিকতার স্বাধীনতা ও আদালতের তদারকির দাবি
সভাপতির বক্তব্যে এবি পার্টির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার যোবায়ের আহমেদ ভূইয়া বলেন, প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা আইনে অপরাধ দমন এবং নাগরিকের মতপ্রকাশের স্বাধীনতার মধ্যে সুস্পষ্ট ভারসাম্য থাকতে হবে।
তিনি বলেন, কনটেন্ট ব্লক বা অপসারণ, ‘গুজব’ ও ‘মিসইনফরমেশন’, অনলাইন মানহানি, অপমান ও বুলিংকে অপরাধের আওতায় আনার ক্ষেত্রে আইনের ভাষা অতিরিক্ত বিস্তৃত ও অস্পষ্ট হলে এর অপব্যবহারের ঝুঁকি তৈরি হবে।
বিশেষ করে আদালতের পূর্বানুমোদন ছাড়া কনটেন্ট অপসারণ বা ব্লকের সুযোগ, ‘reason to believe’-এর মতো subjective মানদণ্ড এবং মতপ্রকাশ-সম্পর্কিত অপরাধে গ্রেপ্তারের ক্ষমতা স্বাধীন মতপ্রকাশ ও সাংবাদিকতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সাংবাদিকদের source confidentiality এবং অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার সুরক্ষার বিষয়টিও আইনে স্পষ্টভাবে নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।
যোবায়ের আহমেদ ভূইয়া বলেন, গুজব, মিসইনফরমেশন, অপমান, হেয় করা বা বুলিংয়ের মতো অস্পষ্ট শব্দের ভিত্তিতে যেন বৈধ রাজনৈতিক সমালোচনা, সাংবাদিকতা বা জনস্বার্থের বক্তব্য অপরাধে পরিণত না হয়।
তিনি বলেন, ব্যাংক হ্যাকিং, ব্যক্তিগত তথ্য চুরি, ransomware, অনলাইন প্রতারণা কিংবা শিশুদের যৌন শোষণের মতো অপরাধ কঠোরভাবে দমন করতে হবে। কিন্তু সরকারের দুর্নীতি নিয়ে প্রশ্ন করা, নীতির সমালোচনা করা, অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করা কিংবা জনস্বার্থে তথ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলাকে শুধু সেই কারণে সাইবার অপরাধ হিসেবে গণ্য করা যাবে না।
তার ভাষায়, “রাষ্ট্র সাইবার অপরাধীর বিরুদ্ধে শক্তিশালী হবে; নাগরিকের কণ্ঠের বিরুদ্ধে নয়।”
সভায় যারা ছিলেন
সভায় আরও বক্তব্য রাখেন অ্যাডভোকেট আবু হানিফা, ছাত্রপক্ষের সভাপতি মোহাম্মদ প্রিন্স, যুব পার্টির সদস্য সচিব হাদীউজ্জামান খোকন ও ব্যারিস্টার ইর্তিকা উদ্দিন।
সভায় কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক সেলিম খান, গণপরিবহন বিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট মতিয়ার রহমান, সড়ক ও যোগাযোগ বিষয়ক সম্পাদক প্রকৌশলী এম শাহেদুল ইসলাম, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সদস্য সচিব বারকাজ নাসির আহমদ, ছাত্রপক্ষের সাধারণ সম্পাদক রাফিউর রহমান ফাত্তার, সহকারী প্রচার সম্পাদক আজাদুল ইসলাম আজাদ, সহকারী অর্থ সম্পাদক আবু বকর সিদ্দিক, সহদপ্তর সম্পাদক মশিউর রহমান মিলু, রমনা থানার আহ্বায়ক আব্দুল কাদের মুন্সী, যাত্রাবাড়ী থানার আহ্বায়ক মিয়া সুলতান আরিফ, ছাত্রপক্ষের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ফওজিয়া ফারিহা করবি, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আহ্বায়ক শেখ মাহমুদুল হাসান আসিফ ও সদস্য নুসরাত রহমান খান, বরিশালের নেতা জাকির হোসেনসহ এবি পার্টি লইয়ার্সের নেতৃবৃন্দ এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিরা।
আপনার মতামত লিখুন :