
জুলাই জাতীয় সনদ স্বাক্ষরের এক বছর পূর্ণ হলেও এর বাস্তবায়ন নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে মতবিরোধ ও অনিশ্চয়তা কাটেনি। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতা ছাড়া এই টানাপড়েন নিরসনের বিকল্প নেই বলে মনে করছে ফ্যাসিবাদ প্রতিরোধ আন্দোলনের সভাপতি অলিদ তালুকদার।
সংগঠনটির সভাপতি মোহাম্মদ অলিদ বিন সিদ্দিক তালুকদার বলেছেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়নে রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক সমঝোতা জরুরি। একই সঙ্গে সংবিধান সংস্কারের প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে সংলাপের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরাও।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে ১৫ বছরের বেশি সময় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। এরপর বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গঠন এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কারের প্রত্যাশা সামনে রেখে শুরু হয় সংস্কারবিষয়ক আলোচনা। এর ধারাবাহিকতায় অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্যোগে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে কয়েক দফা আলোচনা ও মতবিনিময়ের মাধ্যমে প্রণীত হয় জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫।
দীর্ঘ আলোচনা, সংলাপ ও মতপার্থক্য নিরসনের প্রচেষ্টার পর ২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর জাতীয় ঐকমত্য কমিশন ও প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো সনদে স্বাক্ষর করে। রাষ্ট্রকাঠামো, নির্বাচনব্যবস্থা, বিচার বিভাগ ও প্রশাসন সংস্কারসহ বিভিন্ন বিষয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে তৈরি এই সনদে মোট ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব রয়েছে, যার মধ্যে ৪৮টি সংবিধান-সম্পর্কিত।
সনদে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাঠামো, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদের সীমা, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়া পরিবর্তন এবং আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বভিত্তিক নির্বাচনব্যবস্থার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
ফ্যাসিবাদ প্রতিরোধ আন্দোলনের সভাপতি মোহাম্মদ অলিদ বিন সিদ্দিক তালুকদার বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দায়িত্ব রাজনৈতিক দলগুলোর। যে প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সনদটি তৈরি হয়েছে, সেটিকে সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করে অগ্রগতি অর্জন সম্ভব কি না, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি। তাঁর মতে, কোনো রাজনৈতিক দল এই প্রক্রিয়া থেকে বিচ্যুত হচ্ছে কি না, তা নিয়ে নাগরিক সমাজসহ সংশ্লিষ্ট সবার প্রশ্ন তোলা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দিয়েছিলেন রাজনৈতিক দলগুলো। জাতীয় ঐকমত্য কমিশন ও অন্তর্বর্তী সরকারও দ্রুত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। কিন্তু নাগরিকদের প্রত্যাশা এখনো পূরণ হয়নি, যা দুর্ভাগ্যজনক।
সনদ বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতায় ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রায় ৬৯ শতাংশ ভোটার সংবিধান সংস্কারের পক্ষে রায় দেন। জামায়াত নেতৃত্বাধীন বিরোধীদলীয় জোটের সদস্যরা প্রথমে সংসদ সদস্য এবং পরে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেন। অন্যদিকে, বিএনপির সংসদ সদস্যরা শুধু সংসদ সদস্য হিসেবেই শপথ নেন।
নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিএনপি সরকার গঠন করার পরও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের ভূমিকা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সনদ স্বাক্ষরের এক বছর পূর্ণ হলেও এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন এবং সংবিধানে সংস্কার প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়া নিয়ে রাজনৈতিক মতবিরোধ অব্যাহত রয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে সংবিধান সংস্কার পরিষদকে একটি সুস্পষ্ট আইনি কাঠামোর আওতায় আনার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. আল মাসুদ হাসানউজ্জামান বলেন, যেসব বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে, সেগুলো নিরসনে সংবিধান সংস্কার পরিষদকে সামনে রেখে আইনি ভিত্তি তৈরি করা যেতে পারে।
তিনি মনে করেন, এ জন্য সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে সংলাপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আলোচনার মাধ্যমে দুই পক্ষের মতপার্থক্য নিরসন করা গেলে সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে চলমান অনিশ্চয়তা দূর করতে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আস্থা, সংলাপ ও সমঝোতা প্রতিষ্ঠা জরুরি। অন্যথায় রাষ্ট্র সংস্কার নিয়ে জনগণের প্রত্যাশা পূরণে আরও বিলম্বের আশঙ্কা রয়েছে।
আপনার মতামত লিখুন :