Tathyojora.news চাকরির প্রলোভনে রাশিয়ায় পাচার, যুদ্ধে নিহত ২০ বাংলাদেশি - Tathyojora.news

চাকরির প্রলোভনে রাশিয়ায় পাচার, যুদ্ধে নিহত ২০ বাংলাদেশি


নিজস্ব প্রতিবেদক অক্টোবর ১৪, ২০২৬, ৬:৫৫ PM
চাকরির প্রলোভনে রাশিয়ায় পাচার, যুদ্ধে নিহত ২০ বাংলাদেশি

নির্মাণপ্রতিষ্ঠানে চাকরি দেওয়ার কথা বলে ৩০ বাংলাদেশিকে রাশিয়ায় নিয়ে দেশটির সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে একটি মানব পাচার চক্রের বিরুদ্ধে। পরে মাত্র ২১ দিনের সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়ে তাঁদের রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সম্মুখসারিতে পাঠানো হয়। সেখানে ড্রোন হামলায় অন্তত ২০ বাংলাদেশির মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁদের মধ্যে ১৭ জন যুদ্ধক্ষেত্রে মোতায়েনের প্রথম দিনেই প্রাণ হারান বলে জানিয়েছে এসআরবি।

বুধবার (১৪ অক্টোবর) রাজধানীর কারওয়ান বাজারে এসআরবি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরেন এসআরবি-১০ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মোহা. আসাদুজ্জামান।

এ ঘটনায় মানব পাচার চক্রের অন্যতম হোতা জাবালে নূর ইন্টারন্যাশনালের প্রতিষ্ঠাতা মিজানুর রহমান (৫৫) এবং আবু তাহের ওরফে লেন্টুকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।

এসআরবির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ৭ মে জাবালে নূর, আরএস ইন্টারন্যাশনাল ও টিএস গ্রুপ নামের তিন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ৩০ বাংলাদেশিকে রাশিয়ায় পাঠানো হয়। নির্মাণপ্রতিষ্ঠানে কাজের ব্যবস্থা করে দেওয়ার আশ্বাসে তাঁদের প্রত্যেকের কাছ থেকে গড়ে প্রায় ১০ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছিল। তবে রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর প্রতিশ্রুত চাকরিতে নিয়োগ না দিয়ে তাঁদের দেশটির সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হয়। এরপর ২১ দিনের প্রশিক্ষণ শেষে তাঁদের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়।

সংবাদ সম্মেলনে মোহা. আসাদুজ্জামান বলেন, বাংলাদেশ থেকে নেওয়া ব্যক্তিদের যুদ্ধ করার মতো প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ছিল না। তাঁদের সামরিক শারীরিক সক্ষমতা, প্রশিক্ষণ কিংবা যুদ্ধকৌশল-কোনোটিরই পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছিল না। এরপরও কেন এত অল্প সময়ের প্রশিক্ষণ দিয়ে তাঁদের যুদ্ধে পাঠানো হলো, সেই প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, প্রাথমিকভাবে তাঁদের প্রতিপক্ষের অবস্থান শনাক্ত করার কাজে ব্যবহার করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তাঁর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এসব ব্যক্তিকে সামনে রেখে প্রতিপক্ষের অবস্থান শনাক্ত করার একটি কৌশল নেওয়া হয়ে থাকতে পারে। তাঁদের লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালানো হলে হামলাকারী পক্ষের অবস্থান শনাক্ত করার সুযোগ তৈরি হয়।

এসআরবি-১০ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক জানান, যুদ্ধক্ষেত্রের প্রথম, মধ্য ও শেষ-এই তিন ভাগে বাংলাদেশিদের মোতায়েন করা হয়েছিল। মোতায়েনের প্রথম দিন ড্রোন হামলায় ১৭ জন নিহত হন। পরবর্তী সময়ে আরও তিনজনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যায়। সব মিলিয়ে ৩০ জনের মধ্যে ২০ জনের মৃত্যুর বিষয়ে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হয়েছে সংস্থাটি।

আহত হয়ে ফিরেছেন দুজন, আটজনের অবস্থান সম্পর্কে তথ্য

জীবিতদের মধ্যে দুজন আহত অবস্থায় বাংলাদেশে ফিরেছেন বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়। তাঁদের একজন রাজন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোনের আঘাতে তাঁর কোমর ভেঙে যায় এবং শরীরের নিচের অংশ অবশ হয়ে পড়ে। এমন অবস্থায় বুকের ওপর ভর দিয়ে প্রায় চার কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে তিনি ক্যাম্পে পৌঁছান।

বাকি আটজনের মধ্যে দুজন মস্কোর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। অন্য ছয়জন এখনো যুদ্ধক্ষেত্রে অবস্থান করছেন বলে জানান আসাদুজ্জামান।

দেশি-বিদেশি ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততার তথ্য

এসআরবির এই কর্মকর্তা বলেন, বাংলাদেশি ব্যক্তিদের পাশাপাশি রাশিয়ার ইগর নামের এক ব্যক্তি এবং কিরগিজস্তানের জুলিয়া নামের এক নারীও এ মানব পাচারের সঙ্গে জড়িত বলে প্রাথমিকভাবে তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ ও অভিযান অব্যাহত রয়েছে। চক্রের আরেক সদস্য মোস্তাফিজুরকেও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

তিনি আরও জানান, প্রাথমিক অনুসন্ধানে বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের একই ধরনের প্রক্রিয়ায় রাশিয়ার যুদ্ধে যুক্ত করার তথ্য পাওয়া গেছে। বাংলাদেশ থেকে যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে গোপালগঞ্জ, ময়মনসিংহ, নারায়ণগঞ্জ, জামালপুর, পাবনা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, ফরিদপুর, রাজবাড়ী ও গাজীপুরের বাসিন্দারাও রয়েছেন।

স্বজনের মৃত্যুর খবর পেলেও মরদেহ ফেরানোর অনিশ্চয়তা

ভুক্তভোগীদের অধিকাংশই দরিদ্র পরিবারের সন্তান বলে জানান এসআরবির এই কর্মকর্তা। তাঁদের কেউ কেউ ঋণ করে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন। এখন স্বজনের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পরও অনেক পরিবার মরদেহ দেখার কিংবা তা দেশে ফিরিয়ে আনার সুযোগ পাচ্ছে না।

বিদেশে চাকরির প্রলোভনে অর্থ লেনদেনের আগে সতর্ক থাকা এবং যাত্রার পূর্বে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বৈধতা যাচাই করার আহ্বান জানিয়েছেন মোহা. আসাদুজ্জামান।

ঘটনাটি বিদেশে কর্মসংস্থানের আশ্বাসে প্রতারণা ও মানব পাচারের ঝুঁকির পাশাপাশি যুদ্ধক্ষেত্রে বাংলাদেশিদের অনিচ্ছাকৃতভাবে জড়িয়ে পড়ার গুরুতর দিক সামনে এনেছে।