Tathyojora.news দেবীগঞ্জে সংঘর্ষের পর বন্ধ সোনাহার আনন্দ মেলা, অনুমোদন নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন - Tathyojora.news

দেবীগঞ্জে সংঘর্ষের পর বন্ধ সোনাহার আনন্দ মেলা, অনুমোদন নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন


নিজস্ব প্রতিবেদক জুন ৮, ২০২৬, ১২:০৮ অপরাহ্ণ
দেবীগঞ্জে সংঘর্ষের পর বন্ধ সোনাহার আনন্দ মেলা, অনুমোদন নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন

পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ উপজেলার সোনাহার মল্লিকাদহ ইউনিয়নে ঈদ উপলক্ষে আয়োজিত ‘সোনাহার আনন্দ মেলা’কে ঘিরে সংঘর্ষ, মারধর, চুরি ও অনিয়মের নানা অভিযোগের পর অবশেষে মেলাটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে মেলার অনুমোদন কে বা কোন কর্তৃপক্ষ দিয়েছে-তা নিয়েও দেখা দিয়েছে ধোঁয়াশা।

গত শুক্রবার (৫ জুন) বিকেলে সোনাহার মহাবিদ্যালয় মাঠে আয়োজিত মেলায় মোটরসাইকেল প্রবেশকে কেন্দ্র করে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, একপর্যায়ে আয়োজক কমিটির সদস্য মনোয়ার হোসেনকে ধাক্কা দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় সাধারণ দর্শনার্থীদের মারধরের অভিযোগ ওঠে আয়োজক কমিটির কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সংঘর্ষের সময় সোনাহার নুরু বাজার এলাকার লালচান নামে এক যুবককে মারধর করা হয় এবং তার একটি মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে। অভিযোগে আয়োজক কমিটির সদস্য মনোয়ারসহ কয়েকজনের নাম উঠে এসেছে।

মেলায় আগত দর্শনার্থীদের অভিযোগ, বিভিন্ন খেলায় অংশগ্রহণের জন্য জনপ্রতি ৫০ টাকা করে টিকিট নেওয়া হতো। পাশাপাশি নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতির কারণে পরিবার নিয়ে আসা দর্শনার্থীরা উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

এর আগেও একই মেলা থেকে একটি নতুন পালসার ডাবল ডিস্ক মোটরসাইকেল এবং একটি সাইকেলচালিত অটো চুরির ঘটনা ঘটে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। গত ২৯ মে অটোরিকশাচালক রবিউল ইসলাম তার অটো হারানোর পর অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রংপুরে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। রবিউল ইসলাম সোনাহার ২ নম্বর ওয়ার্ডের মাঝাডাঙ্গাপাড়া এলাকার আব্দুল হামিদের ছেলে।

এদিকে মেলায় দোকান ও ব্যবসা পরিচালনাকারীদের কাছ থেকে সাংবাদিকদের জন্য ৩০ হাজার টাকা এবং থানার জন্য ৫০ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগে সোনাহার মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ শফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে নানা আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে।

মেলায় সংঘর্ষ ও মারধরের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ৬ জুন দেবীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সবুজ কুমার বসাক আয়োজকদের মেলা বন্ধের নির্দেশ দেন। পরে মেলাটি আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় কয়েকজন সুশীল সমাজের প্রতিনিধি অভিযোগ করেন, মেলার আর্থিক লেনদেন ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে নানা অনিয়ম হয়েছে। তাদের দাবি, মেলার মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং এতে এলাকার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে।

সোনাহার ঈদ আনন্দ মেলা ও কুটির শিল্প মেলা পরিচালনার জন্য ১৪ সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করা হয়। এতে প্রধান সমন্বয়ক ছিলেন আজিজুল ইসলাম (মাস্টার) এবং যুগ্ম সমন্বয়ক ছিলেন অধ্যক্ষ শফিকুল ইসলাম। এছাড়া কমিটিতে স্থানীয় বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের নেতারাও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।

মেলার সাধারণ সম্পাদক আশিকুর রহমান টুটুল বলেন, শুরুতে একটি সাধারণ মেলার পরিকল্পনা ছিল। তবে পরবর্তীতে মেলার আয়-ব্যয়, পরিচালনা ও অর্থের ব্যবহার সম্পর্কে তাকে কোনো তথ্য জানানো হয়নি। ফলে পরবর্তী কার্যক্রম সম্পর্কে তিনি অবগত ছিলেন না। তিনি জানান, মেলায় চুরি ও মারামারির অভিযোগ তিনি শুনেছেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘটনাগুলোর ভিডিওও দেখেছেন।

অন্যদিকে ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক ও কমিটির সদস্য মনোয়ার হোসেন দাবি করেন, ঘটনার সূত্রপাত হয় একজন মোটরসাইকেল আরোহীকে মেলার ভেতরে প্রবেশে বাধা দেওয়ার পর। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ওই ব্যক্তি জোরপূর্বক মোটরসাইকেল নিয়ে মেলায় ঢোকার চেষ্টা করেন এবং পরিস্থিতি উত্তপ্ত করে তোলেন। তিনি আরও বলেন, প্রচারিত ভিডিওতে ঘটনার আগের অংশ দেখানো হয়নি।

মেলার আয়-ব্যয়ের বিষয়ে জানতে চাইলে মনোয়ার বলেন, অনেকেই মেলায় শ্রম দিলেও কোনো পারিশ্রমিক পাননি; বরং ব্যক্তিগত অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে। বিস্তারিত তথ্য আয়োজক কমিটির সিনিয়র সদস্যরা ভালো বলতে পারবেন বলে তিনি মন্তব্য করেন।

অন্যদিকে সহ-সাধারণ সম্পাদক তহিদুর রহমান মিস্টারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি মিটিংয়ে ব্যস্ত থাকার কথা জানিয়ে ফোন কেটে দেন। পরে আর তার সঙ্গে যোগাযোগ সম্ভব হয়নি।

মেলার অনুমতির বিষয়ে জানতে চাইলে দেবীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সবুজ কুমার বসাক বলেন, এ মেলার জন্য তার দপ্তর থেকে কোনো অনুমতি দেওয়া হয়নি। মেলা কীভাবে অনুমোদন পেয়েছে, সে বিষয়টি তার জানা নেই। তবে বিশৃঙ্খলার তথ্য পাওয়ার পর মেলাটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

দেবীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সেলিম মালিক বলেন, তাদের কাছে তথ্য রয়েছে যে মেলার অনুমোদন জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে দেওয়া হয়েছে। পুলিশ একটি তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। তবে অনুমোদনের আনুষ্ঠানিক কাগজপত্র তাদের কাছে এসেছে কি না, সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত নন।

এদিকে জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোসা. শুকরিয়া পারভীন বলেন, মেলার অনুমোদন কে দিয়েছেন-বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

বর্তমানে মেলা বন্ধ থাকলেও সংঘর্ষ, চুরি, অর্থ লেনদেন ও অনুমোদন সংক্রান্ত অভিযোগগুলো নিয়ে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা চলছে। স্থানীয়দের দাবি, পুরো বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হোক।