
রাজধানীর অন্যতম ব্যস্ত বাণিজ্যিক ও পরিবহন কেন্দ্র গুলিস্তান আবারও পড়েছে চাঁদাবাজ সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে। ফুটপাত থেকে শুরু করে সড়কের বড় অংশ এখন কার্যত হকার ও লাইনম্যানদের দখলে চলে গেছে, ফলে সাধারণ পথচারী ও যানবাহন চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলেও গুলিস্তানের চাঁদাবাজির কাঠামোয় তেমন কোনো পরিবর্তন আসেনি। বরং নতুন পরিচয়ে পুরোনো প্রভাবশালী লাইনম্যানরাই এখনো পুরো এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছেন। জাতীয়তাবাদী হকার্স দলের কিছু সদস্যকে সামনে রেখে অন্তত ২০ জনের একটি শক্তিশালী চক্র গড়ে উঠেছে, যাদের মধ্যে নবী, বাবুল, হারুন ও সালেহ অন্যতম।
গুলিস্তানের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকা—জিরো পয়েন্ট, জিপিও, বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ, গোলাপশাহ মাজার—এসব স্থানে নতুন করে হকার বসাতে হলে দিতে হয় ‘পজিশন ফি’। এই ফি এলাকা ভেদে ২ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে। শুধু বসার অনুমতিই নয়, এরপর প্রতিদিন এবং মাসিক ভিত্তিতেও দিতে হয় নির্ধারিত চাঁদা।
চাঁদা আদায়ের কাঠামো মূলত তিন স্তরে বিভক্ত। প্রতিটি দোকান বা ভ্যান থেকে প্রতিদিন ৫০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়। এছাড়া প্রতিটি ‘বিট’ অনুযায়ী মাসিক ভাড়া গুনতে হয় ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা। বিশেষ দিবস বা উৎসব ঘিরেও দিতে হয় অতিরিক্ত অর্থ। সব মিলিয়ে প্রতিদিন কয়েক কোটি টাকা চাঁদা তোলা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
এলাকাভিত্তিক নিয়ন্ত্রণও ভাগ করে নিয়েছে লাইনম্যানরা। রাজধানী হোটেল ও বেল্টের গলি নিয়ন্ত্রণ করেন নবী, গুলিস্তান সিনেমা হল সংলগ্ন এলাকা হারুনের অধীনে। গুলিস্তান বিল্ডিং থেকে ট্রেড সেন্টার পর্যন্ত রয়েছে রজ্জব, বাবুল, সেলিম, বিমল, বাচ্চু, খোরশেদ, নিপু ও মোহাম্মদ আলীর নিয়ন্ত্রণ। এছাড়া ওসমানী উদ্যান, খদ্দর মার্কেট, স্টেডিয়াম দক্ষিণ গেট, জাসদ ও কমিউনিস্ট পার্টি অফিস সংলগ্ন এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে পৃথক লাইনম্যানদের আধিপত্য রয়েছে।
প্রতিদিন বিকেলে নির্দিষ্ট স্থানে অবস্থান নিয়ে লাইনম্যানদের প্রতিনিধিরা হকারদের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করেন। কেউ চাঁদা দিতে অস্বীকার করলে বা দেরি করলে তাকে উচ্ছেদ কিংবা শারীরিক নির্যাতনের শিকার হতে হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
এই চক্রের পেছনে সক্রিয় রয়েছে একাধিক হকার্স সংগঠনও। বাংলাদেশ হকার্স ইউনিয়ন, হকার্স সংগ্রাম পরিষদ, ছিন্নমূল হকার্স সমিতি—এসব সংগঠনের নেতাদের নামও সামনে এসেছে। তবে বাংলাদেশ হকার্স ফেডারেশনের সভাপতি এম এ কাশেম বলেছেন, হকারদের শৃঙ্খলার আওতায় আনতে হলে প্রথমেই লাইনম্যানদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে এবং সিটি করপোরেশনের তালিকা অনুযায়ী বৈধ হকারদের আইডি কার্ডের মাধ্যমে নির্দিষ্ট স্থানে বসাতে হবে।
এদিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর সিটি করপোরেশন। তারা নির্দিষ্ট স্থানে হকার পুনর্বাসন এবং আইডি কার্ড প্রদানের পরিকল্পনা নিয়েছে। যদিও সম্প্রতি গুলিস্তান ও বায়তুল মোকাররম এলাকায় উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছিল, কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায় এলাকা।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুস সালাম জানিয়েছেন, চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি রয়েছে। বৈধ হকারদের কার্ড দেওয়া হলে তাদের কাছ থেকে কেউ চাঁদা নিতে পারবে না বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
সব মিলিয়ে, নিয়ন্ত্রণের চেষ্টার পরও গুলিস্তানে চাঁদাবাজ সিন্ডিকেটের প্রভাব কমেনি; বরং নতুন মোড়কে পুরোনো কাঠামোই আবার দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে।
আপনার মতামত লিখুন :