
৩২ পৃষ্ঠার চুক্তিতে “শ্যাল” ১৭৯ বার, “উইল” মাত্র ৩-ভাষাতেই ভারসাম্যহীনতার ইঙ্গিত
বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত পারস্পরিক বাণিজ্যচুক্তিতে বাধ্যবাধকতার ক্ষেত্রে বড় ধরনের অসমতা উঠে এসেছে। চুক্তির বিশ্লেষণে দেখা যায়, “শ্যাল” শব্দের মাধ্যমে বাংলাদেশকে ১৩১টি ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে তা মাত্র ৬টি।
বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে “এগ্রিমেন্ট অন রিসিপ্রোকাল ট্রেড (এআরটি)” শীর্ষক বাণিজ্যচুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয় গত ৯ ফেব্রুয়ারি, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তিন দিন আগে। পরবর্তীতে ২০ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট পাল্টা শুল্ক সংক্রান্ত একটি সিদ্ধান্ত বাতিল করে। চুক্তিটি এখনো কার্যকর হয়নি, তবে এর বিভিন্ন ধারা অনুযায়ী বাংলাদেশ ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র থেকে পণ্য আমদানির উদ্যোগ নেওয়ায় নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
চুক্তির ভাষা বিশ্লেষণে দেখা যায়, “শ্যাল” (অর্থাৎ বাধ্যতামূলক) শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে মোট ১৭৯ বার, যার মধ্যে “বাংলাদেশ শ্যাল” রয়েছে ১৩১ বার এবং “ইউএস শ্যাল” মাত্র ৬ বার। অন্যদিকে “উইল” (অর্থাৎ ইচ্ছাধীন) শব্দটি এসেছে মাত্র ৩ বার। এ থেকেই বোঝা যায়, চুক্তির কাঠামোতে বাধ্যবাধকতার ভার বাংলাদেশের দিকেই বেশি।
এই চুক্তি নিয়ে জাতীয় সংসদে আপত্তি জানিয়েছেন সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠন থেকেও চুক্তি বাতিলের দাবি উঠেছে। অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ আলোচনার মাধ্যমে ভারসাম্যপূর্ণ সমাধানের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।
চুক্তির ধারা ও বিষয়বস্তু:
চুক্তির মূল অংশে ৬টি ধারা থাকলেও বাস্তবায়নের বিস্তারিত নির্দেশনা সংযুক্ত পরিশিষ্টে দেওয়া হয়েছে, যা চুক্তির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচিত।
শুল্ক ও কোটা:
চুক্তির প্রথম ধারায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের ওপর নির্ধারিত শুল্ক আরোপ করবে, তবে কোনো কোটা ব্যবস্থা চালু করতে পারবে না। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রও তাদের নির্ধারিত হারে শুল্ক আরোপ করবে।
পরিশিষ্টে শুল্ক কমানোর বিভিন্ন ধাপ নির্ধারণ করা হয়েছে। কিছু পণ্যে চুক্তি কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই শুল্ক শূন্য হবে, আবার কিছু ক্ষেত্রে ৫ বা ১০ বছরের মধ্যে ধাপে ধাপে শুল্ক হ্রাস পাবে। কিছু পণ্যে বিদ্যমান শুল্ক অপরিবর্তিত থাকবে।
অশুল্ক বাধা ও সংশ্লিষ্ট বিধান:
এই অংশে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ এমন কোনো প্রশাসনিক বা নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে না, যা মার্কিন পণ্যের আমদানিকে বাধাগ্রস্ত করে।
এর মধ্যে রয়েছে-
আমদানি লাইসেন্স আরোপ না করা
অতিরিক্ত পরীক্ষা, অনুমোদন বা কাগজপত্রের বাধ্যবাধকতা না দেওয়া
আন্তর্জাতিক বা মার্কিন মান মেনে চলা পণ্যকে গ্রহণ করা
কৃষি, খাদ্য ও সংশ্লিষ্ট মান:
মার্কিন কৃষিপণ্যের জন্য বাংলাদেশি বাজারে প্রবেশ সহজ করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য ও সুরক্ষা ব্যবস্থা বিজ্ঞানভিত্তিক ও ঝুঁকি মূল্যায়নের ওপর নির্ভরশীল হতে হবে।
মার্কিন সংস্থার অনুমোদিত খাদ্য ও কৃষিপণ্যকে গ্রহণযোগ্য হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। পোলট্রি বা ডিম আমদানির ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ অঞ্চল নিষিদ্ধ না করে নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে নিয়ন্ত্রণ আরোপের কথা বলা হয়েছে।
চিকিৎসা যন্ত্র ও ওষুধ:
চুক্তি অনুযায়ী, এফডিএ অনুমোদিত চিকিৎসা যন্ত্র ও ওষুধকে বাংলাদেশে গ্রহণযোগ্য হিসেবে ধরা হবে। ইলেকট্রনিক সনদ গ্রহণ করতে হবে এবং পুনরায় অনুমোদনের প্রয়োজনীয়তা সীমিত রাখতে হবে।
মোটরযান ও পুনর্নির্মিত পণ্য:
মার্কিন মান অনুযায়ী তৈরি মোটরযান ও যন্ত্রাংশ বাংলাদেশে গ্রহণ করতে হবে। পুনর্নির্মিত পণ্যের ওপর বিদ্যমান নিষেধাজ্ঞা ও লাইসেন্সিং ব্যবস্থা তুলে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
মেধাস্বত্ব সুরক্ষা:
বাংলাদেশকে কপিরাইট ও ট্রেডমার্ক সুরক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। অনলাইন ক্ষেত্রেও এই সুরক্ষা প্রযোজ্য হবে। পাশাপাশি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মেধাস্বত্ব চুক্তিতে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে যুক্ত হওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
সেবা খাত:
বাংলাদেশ এমন কোনো বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারবে না, যাতে মার্কিন সেবাপ্রতিষ্ঠান দেশীয় বা অন্য বিদেশি প্রতিষ্ঠানের তুলনায় কম সুবিধা পায়।
ডিজিটাল বাণিজ্য ও প্রযুক্তি:
এই ধারায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশ মার্কিন ডিজিটাল সেবার ওপর বৈষম্যমূলক কর আরোপ করবে না। সীমান্ত পেরিয়ে ডেটা আদান-প্রদান সহজ করতে হবে এবং সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ে সহযোগিতা বাড়াতে হবে।
সীমান্ত, কর ও বাণিজ্য নীতি:
যুক্তরাষ্ট্র যদি নিজেদের রপ্তানিকারকদের কর সুবিধা দেয়, বাংলাদেশ তার বিরোধিতা করতে পারবে না। ভ্যাট ব্যবস্থায় বৈষম্য দূর করতে হবে এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কাস্টমস প্রক্রিয়া ডিজিটাল করতে হবে।
শ্রম আইন ও ইপিজেড:
চুক্তিতে শ্রম আইন সংস্কার, ইউনিয়ন গঠনের শর্ত সহজ করা এবং শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। ইপিজেড এলাকায় শ্রমিকদের সংগঠন করার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
পরিবেশ ও সম্পদ ব্যবস্থাপনা:
বাংলাদেশকে পরিবেশ সুরক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। অবৈধ বনজ পণ্য, বন্যপ্রাণী বাণিজ্য এবং অতিরিক্ত মৎস্য আহরণ নিয়ন্ত্রণের বিষয়গুলোও এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
বিনিয়োগ ও রাষ্ট্রায়ত্ত খাত:
জ্বালানি, টেলিযোগাযোগ ও অবকাঠামো খাতে মার্কিন বিনিয়োগ সহজ করার কথা বলা হয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাজারভিত্তিক নীতিতে পরিচালনা করতে হবে এবং ভর্তুকি ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনতে হবে।
নিরাপত্তা ও কৌশলগত বিষয়:
সংবেদনশীল প্রযুক্তি ও পণ্যের বাণিজ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বয় করার বিষয়টি চুক্তিতে উল্লেখ রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট দেশের সঙ্গে প্রযুক্তিগত লেনদেন সীমিত করার দিকনির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
পোশাক খাত:
বাংলাদেশের কিছু বস্ত্র ও পোশাকপণ্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে কম বা শূন্য শুল্কে প্রবেশের সুযোগ পেতে পারে। তবে এই সুবিধা নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে কাঁচামাল আমদানির ওপর।
চুক্তি বাতিলের বিধান:
চুক্তির শর্ত লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠলে যুক্তরাষ্ট্র আলোচনা শেষে চুক্তি বাতিল করতে পারবে এবং আগের শুল্কহার পুনর্বহাল করতে পারবে। উভয় পক্ষ ৬০ দিনের নোটিশ দিয়ে চুক্তি বাতিল করতে পারবে।
এই চুক্তিটি এখনো কার্যকর হয়নি। তবে এর বিভিন্ন শর্ত ও কাঠামো নিয়ে চলমান আলোচনা ইঙ্গিত দিচ্ছে-এটি কার্যকর হলে বাংলাদেশের বাণিজ্যনীতি, বিনিয়োগ পরিবেশ এবং অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে।
আপনার মতামত লিখুন :