
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের ভোলা-৪ (চরফ্যাশন-মনপুরা) আসনের সংসদ সদস্য ও যুবদল কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সাধারণ সম্পাদক মো. নুরুল ইসলাম নয়নের শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। নির্বাচনী হলফনামায় দাখিল করা শিক্ষাগত সনদ নিয়ে প্রশ্ন তুলে তাঁর সংসদ সদস্য পদ বাতিলের দাবিতে হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করেছেন ওই আসনের ভোটার আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ। রিট নম্বর ১২৩৮৩/২০২৬।
এদিকে ইবাইস ইউনিভার্সিটির একটি সনদ নিয়ে আপত্তির পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অফিস থেকে ইস্যু করা একটি অনুমতিপত্র ঘিরেও নতুন প্রশ্ন উঠেছে। ২০২৪-২০২৫ শিক্ষাবর্ষে এমএ শ্রেণিতে পুনঃভর্তি হয়ে পুরোনো সিলেবাসে এমএ শেষ পর্বের পরীক্ষায় অংশগ্রহণের অনুমতি দেওয়া হয়েছে বলে ওই নথিতে উল্লেখ রয়েছে। অনুমতিপত্রটি ইস্যু করা হয় ২০২৬ সালের ১ অক্টোবর।
ফ্যাসিবাদ প্রতিরোধ আন্দোলনের সভাপতি মোহাম্মদ অলিদ বিন সিদ্দিক তালুকদার এ ঘটনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, নির্বাচন কমিশন এবং জনপ্রতিনিধিদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। তাঁর প্রশ্ন, ১৯৮৯-৯০ শিক্ষাবর্ষের একজন শিক্ষার্থী কীভাবে দীর্ঘ সময় পর পুরোনো সিলেবাসে এমএ পরীক্ষায় অংশগ্রহণের অনুমতি পেলেন এবং এ ক্ষেত্রে কী প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে?
হলফনামায় শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে অভিযোগ
রিটকারী আব্দুল্লাহ আল মাহমুদের আবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচিত হন নুরুল ইসলাম নয়ন। নির্বাচনী হলফনামায় তাঁর সর্বোচ্চ শিক্ষাগত যোগ্যতা হিসেবে ‘মাস্টার অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এমবিএ), মেজর ইন ম্যানেজমেন্ট, সিজিপিএ ৩.২৮, নভেম্বর ২০০৮’ উল্লেখ করে ইবাইস ইউনিভার্সিটির একটি সনদ দাখিল করা হয়।
রিটকারীর দাবি, ইবাইস ইউনিভার্সিটি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার মো. আলমগীর হোসেন জানান, ওই সনদটি তাঁদের ইস্যু করা নয়। সনদে ‘Checked and Fake’ সিল দিয়ে স্বাক্ষর করা হয়েছে বলেও আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট চিঠিটি রিটের সংযুক্তি-১ হিসেবে দাখিল করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
তবে সনদসংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বিস্তারিত বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট নথির স্বাধীন যাচাই প্রয়োজন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী পরিচয় নিয়েও প্রশ্ন
রিটে বলা হয়েছে, নুরুল ইসলাম নয়ন দীর্ঘদিন ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগ থেকে অনার্স ও মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জনের কথা বলে আসছেন। তিনি মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হলের ১৯৮৯-৯০ শিক্ষাবর্ষের আবাসিক শিক্ষার্থী ছিলেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সহসভাপতি ছিলেন বলেও প্রচার রয়েছে।
অন্যদিকে, রিটকারীর দাবি, মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হল এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার ভবনের সার্টিফিকেট ও মার্কশিট শাখায় ‘মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম নয়ন, পিতা-মোহাম্মদ মহিউদ্দিন মিয়া’ নামে ইংরেজি বিভাগের ১৯৮৮ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত কোনো শিক্ষার্থীর অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। তাঁর উইকিপিডিয়া প্রোফাইলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী হিসেবে পরিচয়ের তথ্য রয়েছে বলে রিটে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া, ২০১৮ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র দাখিলের সময় নুরুল ইসলাম নয়ন তাঁর সর্বোচ্চ শিক্ষাগত যোগ্যতা ‘এমএ’ উল্লেখ করেছিলেন এবং তখন শুধু ১৯৮৭ সালের এসএসসি পাসের সনদ জমা দিয়েছিলেন বলে রিটকারীর দাবি। অথচ ২০২৬ সালের নির্বাচনে তিনি এমবিএ ডিগ্রিধারী হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করেছেন-এ বিষয়টিকেও আবেদনে অসংগতি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
৩০ বছর পর এমএ পরীক্ষার অনুমতি নিয়ে নতুন প্রশ্ন
বিতর্কের মধ্যে সামনে এসেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অফিস থেকে ইস্যু করা ১ অক্টোবর ২০২৬ তারিখের একটি অনুমতিপত্র। এতে ২০২৪-২০২৫ শিক্ষাবর্ষে এমএ শ্রেণিতে পুনঃভর্তি হয়ে পুরোনো সিলেবাসে এমএ শেষ পর্বের পরীক্ষায় অংশগ্রহণের অনুমতির কথা উল্লেখ রয়েছে।
এ নথিকে কেন্দ্র করে অভিযোগকারীদের প্রশ্ন, ১৯৮৮ থেকে ১৯৯২ সালের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী হিসেবে যাঁর অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি বলে রিটে দাবি করা হয়েছে, তাঁকে কী প্রক্রিয়ায় পুনঃভর্তি এবং পুরোনো সিলেবাসে পরীক্ষায় অংশগ্রহণের অনুমতি দেওয়া হলো?
ফ্যাসিবাদ প্রতিরোধ আন্দোলনের সভাপতি মোহাম্মদ অলিদ বিন সিদ্দিক তালুকদার এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ওবায়দুল ইসলামসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যাখ্যা দাবি করেছেন। তাঁর মতে, অনুমতিপত্রটি সামনে আসার পর বিষয়টি আরও গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন। তবে নথিটির প্রেক্ষাপট, পুনঃভর্তির প্রক্রিয়া এবং পরীক্ষায় অংশগ্রহণের যোগ্যতা সম্পর্কে বিশ্ববিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা পাওয়া জরুরি।
হাইকোর্টে রিটের শুনানিতে কী ঘটেছিল
রিটের তথ্য অনুযায়ী, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ বিচারপতি আহমেদ সোহেল ও বিচারপতি এস এম ইফতেখার উদ্দিন মাহমুদের ডিভিশন বেঞ্চে শুনানি হয়।
শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল (ডিএজি) বলেন, রিটকারী ২৫ আগস্ট নির্বাচন কমিশনে আবেদন করেন এবং ৩১ আগস্ট রিটের এফিডেভিট করেন। নির্বাচন কমিশনকে তদন্ত বা অনুসন্ধান কমিটি গঠনের পর্যাপ্ত সময় না দিয়েই রিট করা হয়েছে বলে রাষ্ট্রপক্ষ যুক্তি দেয়।
ওই যুক্তির পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচন কমিশনকে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য যথেষ্ট সময় না দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে রিটটি খারিজ করা হয় বলে প্রদত্ত বিবরণে উল্লেখ রয়েছে।
রিটকারীর আইনজীবী সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের আইনজীবী রাফসান আল আলভীর বক্তব্য অনুযায়ী, দেড় মাসের অবকাশকালীন ছুটির পর যথাযথভাবে আবেদন করা হলে আদালতে বিষয়টি পুনরায় শুনানির সুযোগ থাকতে পারে।
এ ছাড়া, ১৬ সেপ্টেম্বর বিচারপতি আহমেদ সোহেলের বেঞ্চ আদেশটি ‘নট টু ডে’ করে পরবর্তী দিনের জন্য রাখেন বলে দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। রিটের শুনানি ও আদেশের ধারাবাহিকতা সম্পর্কে আদালতের নথি থেকে চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
কী বলছেন এমপি নয়ন ও তাঁর আইনজীবী
অভিযোগের বিষয়ে গণমাধ্যমে নুরুল ইসলাম নয়ন বলেন, “যে কেউ যেকোনো অভিযোগ বিষয়ে রিট করতেই পারেন। এটা তার আইনগত অধিকার। আদালত যদি এ বিষয়ে রুলিং দেন, সে প্রেক্ষিতে আমি আইনগতভাবেই ব্যবস্থা নেব।”
তাঁর আইনজীবী মনির হোসেন বলেন, “রাজনীতিতে প্রতিদ্বন্দ্বীরা অনেক ষড়যন্ত্র করে। এই রিটও সেই ষড়যন্ত্রের অংশ। রিটের গ্রাউন্ড না থাকায় ইতোমধ্যেই কোর্ট খারিজ করে দিয়েছেন।”
অন্যদিকে, ইবাইস ইউনিভার্সিটির রেজিস্ট্রার মো. আলমগীর হোসেনের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোতালেব তালুকদার দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, নথি না দেখে এ বিষয়ে মন্তব্য করা উচিত হবে না। অফিস সময়ে ফাইল দেখে সঠিক তথ্য জানাতে পারবেন বলে তিনি জানান।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাড়ছে জবাবদিহির দাবি
এ অভিযোগ এমন সময় সামনে এসেছে, যখন বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দলের শৃঙ্খলা ও ভাবমূর্তি রক্ষায় ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা ঘোষণা করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। গত সপ্তাহে ফেনীর জনসভা এবং ১০ অক্টোবর স্থায়ী কমিটির বৈঠকে তিনি দলের নাম ব্যবহার করে বিতর্কিত কর্মকাণ্ড বা দুর্নীতিতে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা বলেছেন বলে দলীয় সূত্রের বরাতে দাবি করা হয়েছে।
এ প্রেক্ষাপটে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির পদত্যাগ এবং ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির কমিটি বিলুপ্তির বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের দায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুরো দল বা সরকারের ওপর বর্তায় না। তবে অভিযোগের নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত এবং প্রমাণ পাওয়া গেলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ রাজনৈতিক দল ও প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ।
নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
ফ্যাসিবাদ প্রতিরোধ আন্দোলনের সভাপতি মোহাম্মদ অলিদ বিন সিদ্দিক তালুকদার মনে করেন, নির্বাচনী হলফনামায় শিক্ষাগত যোগ্যতা সম্পর্কে অসত্য তথ্য দেওয়ার অভিযোগ উঠলে তা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা উচিত। তাঁর মতে, জনপ্রতিনিধিদের যোগ্যতা ও হলফনামার তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, জালিয়াতি বা মিথ্যা তথ্যের মাধ্যমে কেউ জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হলে সংসদের কার্যকারিতা ও জনআস্থার প্রশ্ন সামনে আসে। এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন কী পদক্ষেপ নিচ্ছে, তা জনগণের সামনে স্পষ্ট হওয়া দরকার।
স্পিকার ও প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান
ফ্যাসিবাদ প্রতিরোধ আন্দোলনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে অর্জিত পরিবর্তনের সঙ্গে কোনোভাবেই বিশ্বাসঘাতকতা করা যাবে না। শহীদদের আত্মত্যাগের মর্যাদা রক্ষায় জনপ্রতিনিধিদের সততা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।
সংগঠনটির সভাপতি মোহাম্মদ অলিদ বিন সিদ্দিক তালুকদার জাতীয় সংসদের স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ এবং বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি বিশেষ আহ্বান জানিয়ে বলেন, এ ধরনের অভিযোগের বিষয়ে তাঁদের কার্যকর ভূমিকা দেখতে চায় দেশের সর্বস্তরের মানুষ এবং বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা।
তিনি মনে করেন, অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হলে জনপ্রতিনিধিদের প্রতি জনগণের আস্থা বজায় রাখা সম্ভব হবে।
তবে নুরুল ইসলাম নয়নের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর সত্যতা, শিক্ষাগত সনদের বৈধতা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমতিপত্রের প্রেক্ষাপট নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য ও তদন্তের ফল গুরুত্বপূর্ণ। আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে অভিযোগগুলোকে প্রমাণিত অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।
আপনার মতামত লিখুন :