Tathyojora.news ‘বিএনপির মুখে জুলাই, অন্তরে আওয়ামী লীগ’: বিচার নিয়ে সরকারকে হাসনাতের কড়া সমালোচনা - Tathyojora.news

‘বিএনপির মুখে জুলাই, অন্তরে আওয়ামী লীগ’: বিচার নিয়ে সরকারকে হাসনাতের কড়া সমালোচনা


নিজস্ব প্রতিবেদক অক্টোবর ১৩, ২০২৬, ৮:১২ PM
‘বিএনপির মুখে জুলাই, অন্তরে আওয়ামী লীগ’: বিচার নিয়ে সরকারকে হাসনাতের কড়া সমালোচনা

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে সরকারের ভূমিকার কঠোর সমালোচনা করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সংগঠক (দক্ষিণাঞ্চল) হাসনাত আবদুল্লাহ। তাঁর অভিযোগ, জুলাই গণহত্যার বিচার সরকারের কাছে দায়সারা বিষয়ে পরিণত হয়েছে। বিএনপির রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ‘বিএনপির মুখে জুলাই, অন্তরে আওয়ামী লীগ।’

মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) বিকেলে রাজধানীর বাংলামোটরে এনসিপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ‘জুলাই গণহত্যার বিচার: রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার ব্যবধান’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় এসব কথা বলেন তিনি। এনসিপির ‘জুলাই গণহত্যা ও গুমের বিচার পর্যবেক্ষণ বিষয়ক কমিটি’ এ সভার আয়োজন করে।

সভায় হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, রাষ্ট্রকাঠামোর পরিবর্তন ও সবার জন্য ন্যায়সংগত আচরণ নিশ্চিত করার প্রত্যাশা থাকলেও বাস্তবে কেবল ক্ষমতার চেয়ার বদলেছে। কেউ সংসদ সদস্য, কেউ মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী হয়েছেন; কিন্তু রাষ্ট্রব্যবস্থার কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন হয়নি।

সরকারের পরিস্থিতি বোঝাতে ফিটনেসবিহীন গাড়ির উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, গাড়ির ইঞ্জিন, স্টিয়ারিং ও চাকা ঠিক না থাকলে দক্ষ চালক দিয়েও গন্তব্যে পৌঁছানো সম্ভব নয়। তাঁর ভাষ্য, এমন একটি গাড়ির চালকের আসনে তারেক রহমানকে বসানো হয়েছে। রাষ্ট্র সংস্কারের পরিবর্তে বিএনপি সরকার ক্ষমতাকেন্দ্রিক ব্যবসা, দুর্নীতি ও আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের পথে এগোচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

বিএনপির অভ্যন্তরীণ রাজনীতি প্রসঙ্গে হাসনাত বলেন, দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময় ধরে নির্যাতন, মামলা ও কারাবরণের শিকার নেতাকর্মীদের সঙ্গে ৫ আগস্টের পর দলে যুক্ত হওয়া একটি অংশের পার্থক্য রয়েছে। তাঁর অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নির্যাতিত অনেক বিএনপি নেতাকর্মী এখন দলে গুরুত্ব পাচ্ছেন না। বিপরীতে, নতুন করে যুক্ত হওয়া একটি অংশ ব্যবসায়িক সুবিধা ও প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পাচ্ছে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে তিনি বক্তব্যে বিস্তারিত প্রমাণ তুলে ধরেননি।

জুলাই হত্যাকাণ্ডের মামলার তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ড ও সহিংসতার ঘটনায় দায়ের করা মামলাগুলোর তদন্তের অগ্রগতি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন হাসনাত আবদুল্লাহ। তাঁর অভিযোগ, ভুক্তভোগীদের সঙ্গে যথাযথ আলোচনা ছাড়াই অনেক মামলায় বিপুলসংখ্যক ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। পরে এসব মামলা অর্থ আদায় ও আপস-বাণিজ্যের উপলক্ষ হয়ে উঠছে।

তিনি বলেন, সারা দেশের থানাগুলোতে দায়ের করা মামলাগুলোর কতটির অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে, সেই হিসাব সাংবাদিকদের সামনে তুলে ধরা প্রয়োজন। দ্রুত তদন্ত শেষ করে প্রকৃত অপরাধীদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল এবং আওয়ামী লীগকে দল হিসেবে বিচারের আওতায় আনারও দাবি জানান তিনি।

হাসনাতের মতে, তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ায় ধীরগতির কারণে প্রকৃত অপরাধীদের বিচারের বিষয়টি প্রশ্নের মুখে পড়ছে। তাই দ্রুত তদন্ত শেষ করা, অভিযোগপত্র দেওয়া এবং বিচারিক কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া জরুরি।

সরকারের অর্থনৈতিক নীতি নিয়েও সমালোচনা করেন এনসিপির এই নেতা। তিনি বলেন, সরকার ৬ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রার কথা বললেও বর্তমান পরিস্থিতিতে তা অর্জন কঠিন। এ সময় আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাসে প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪২ শতাংশে নেমে আসার কথা উল্লেখ করেন তিনি।

কর্মসংস্থান ও ব্যবসার সুযোগ বণ্টনেও বৈষম্যের অভিযোগ করেন হাসনাত। তাঁর দাবি, সাধারণ মানুষের তুলনায় প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবারের সদস্যরা বেশি সুবিধা পাচ্ছেন। সারসহ বিভিন্ন পণ্যের ডিলারশিপ বণ্টন এবং সরকারি ঠিকাদারি কাজেও স্বজনপ্রীতি হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইনমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকা সালাহউদ্দিন আহমেদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, সম্পদ বৃদ্ধি ও প্রভাব খাটানোর অভিযোগও তোলেন হাসনাত। তাঁর দাবি, সালাহউদ্দিন আহমেদের ছেলে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার পর ঠিকাদারি ব্যবসায় যুক্ত হয়েছেন। বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সম্পর্ক নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। এসব অভিযোগের বিষয়ে সভায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য তুলে ধরা হয়নি।

আওয়ামী লীগের দলীয় বিচার ও জবাবদিহির দাবি

আওয়ামী লীগের বিচার ও রাজনৈতিক পুনর্বাসনের প্রশ্নে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, শুধু ব্যক্তিবিশেষের বিচার নয়, দল হিসেবেও আওয়ামী লীগকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। তাঁর অভিযোগ, দলটি এখনো অতীতের অপরাধ স্বীকার করেনি।

তিনি প্রশ্ন তোলেন, অপরাধ স্বীকার না করলে পুনর্মিলনের আলোচনা কীভাবে আসতে পারে। দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী শাসনের সঙ্গে যুক্ত ন্যাশনাল পার্টির রাজনৈতিক পরিণতির উদাহরণ টেনে আওয়ামী লীগের বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার কথা বলেন তিনি।

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের মামলাগুলোর বিচার দ্রুত শেষ করা, আদালতের দেওয়া রায় কার্যকর করা এবং পলাতক আসামিদের ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়ারও দাবি জানান হাসনাত।

বিএনপির তৃণমূলের নেতাকর্মীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, দীর্ঘদিন নির্যাতন-নিপীড়ন সহ্য করেও অনেকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে বঞ্চিত রয়েছেন। অন্যদিকে, দলের প্রভাবশালী নেতাদের পরিবারের সদস্যরা ব্যবসা ও মনোনয়নের ক্ষেত্রে সুবিধা পাচ্ছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।

হাসনাত বলেন, বিচার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের লড়াই চলবে। বিএনপি সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রীরাও জনগণের জন্য কাজ করবেন এবং দুর্নীতির বিচার নিশ্চিত করবেন-এটাই তাঁদের প্রত্যাশা।

বিচার নিয়ে বিএনপি ও সরকারের সমালোচনায় অন্য বক্তারা

আলোচনা সভায় এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট আব্দুল্লাহ আল আমিন এমপি বলেন, জুলাই গণহত্যার বিচার দায়সারা বিষয়ে পরিণত হয়েছে। দুবাইয়ে বেনজীরকে আটক করার ঘটনায় সরকার সংসদে কৃতিত্ব দাবি করলেও পরে তিনি মুক্তি পাওয়ার পর সরকার নীরব রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

বিএনপির বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার অভিযোগ তুলে আব্দুল্লাহ আল আমিন বলেন, দলটি চাঁদাবাজি সামলাতেই হিমশিম খাচ্ছে; এমন পরিস্থিতিতে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিচার কীভাবে করবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিএনপি দলে চাঁদাবাজদের স্থান নেই-সরকারের এমন বক্তব্যের সমালোচনা করে তিনি দাবি করেন, দলটিতে বিপুলসংখ্যক চাঁদাবাজ রয়েছে। এ ছাড়া বিএনপির ১৭ বছরের নির্যাতিত হওয়ার ইতিহাসকে স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও ভাঙচুরের বৈধতা হিসেবে ব্যবহার করা যায় না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট মুজাহিদুল ইসলাম শাহীন বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মাত্র ১৩টি মামলার বিচার চলছে। বিচারকাজ ত্বরান্বিত করতে ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা বাড়ানোর দাবি জানিয়ে আসা হলেও তা করা হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেন তিনি। জুলাই গণহত্যার বিচার দ্রুত এগিয়ে নিতে বিএনপি সরকারের প্রতি আহ্বান জানান শাহীন।

এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট হুমায়রা নূর অভিযোগ করেন, জুলাই গণহত্যার মামলার তদন্তের দায়িত্বে থাকা কিছু পুলিশ সদস্য আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছেন না। একটি মামলায় সাজাপ্রাপ্ত সাতজনের সবাই পলাতক থাকার প্রসঙ্গ তুলে তিনি তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শহীদদের রক্তের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে কাজ করার আহ্বান জানান।

ন্যাশনাল লইয়ার্স অ্যালায়েন্সের সদস্যসচিব অ্যাডভোকেট এরশাদুল বারী খন্দকার বলেন, যে বিরোধী দল ১৭ বছরেও আন্দোলন গড়ে তুলতে পারেনি, তাদের ওপর আস্থা রাখা বড় ভুল ছিল। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের বক্তব্য শুনে সরকারের জুলাই গণহত্যার বিচার করার সদিচ্ছা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

শহীদ পরিবারের সদস্য ও আহত জুলাই যোদ্ধাদের দাবি

জুলাই শহীদ মাহমুদুর রহমান সৈকতের বোন সাবরিনা আফরোজ সেবন্তী বলেন, শেখ হাসিনা, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং আইজিপি আব্দুল্লাহ আল মামুনের সাজা ঘোষণার ক্ষেত্রে আব্দুল্লাহ আল মামুনের শাস্তি যথেষ্ট নয় বলে তাঁরা মনে করেন। ফাঁসির রায় কার্যকরে সুনির্দিষ্ট উদ্যোগ এবং সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে স্পষ্ট অগ্রগতির তথ্য দেওয়ার দাবি জানান তিনি।

সাবরিনা বলেন, অনেক ক্ষেত্রে নির্দোষ ব্যক্তিদেরও মামলায় আসামি করা হয়েছে। তিনি নিজের ভাই হত্যার সঙ্গে জড়িতদের প্রকৃত বিচার চান। তাঁর ভাষ্য, ভাই হত্যার পর সাংবাদিকেরা মামলা করবেন কি না জানতে চাইলেও তাঁরা তখন মামলা করেননি। ৫ আগস্টের পর বিচার চাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে তাঁরা মামলা করেছেন।

জুলাই ওয়ারিয়র্স অ্যালায়েন্সের সভাপতি ও আহত জুলাই যোদ্ধা মো. সালমান হোসেন বলেন, ১৯ জুলাই শুক্রবার জুমার দিন তিনি গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হন। নিজের ট্রমার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে একই ধরনের মানসিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে রাত কাটাতে হলে বিচারের জন্য আহত ও ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা কেন বারবার দাবি জানাচ্ছেন, তা তিনি বুঝতে পারতেন।

সভায় এনসিপির কেন্দ্রীয় সংগঠক অ্যাডভোকেট আরমান হোসাইনের সঞ্চালনায় আরও বক্তব্য দেন জুলাই ওয়ারিয়র্স অ্যালায়েন্সের সহসভাপতি ও আহত জুলাই যোদ্ধা মারুফা আক্তার মায়া। তিনি বলেন, প্রতিটি রাজনৈতিক দলের কাছে তাঁরা জানতে চান, জুলাই গণহত্যার বিচার কার্যকরে দলগুলো কতটা আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছে।

আলোচনা সভায় বক্তারা জুলাই গণহত্যার মামলাগুলোর দ্রুত তদন্ত, প্রকৃত অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা, আদালতের রায় কার্যকর এবং বিচারপ্রক্রিয়ায় জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানান।