
রাজধানীর বংশালে বেসিক ব্যাংকের শাখার রান্নাঘরে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে নিরাপত্তাকর্মী ইব্রাহিম শেখের মৃত্যুকে ঘিরে নানা প্রশ্ন উঠেছে। ঘটনাটি নিছক দুর্ঘটনা, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো কারণ রয়েছে-তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তাঁর স্বজনরা। একই সঙ্গে ঘটনার সময়কার সিসিটিভি ফুটেজ ও সংশ্লিষ্ট সব আলামত সুরক্ষিত রাখার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।
পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ অক্টোবর ব্যাংকের বংশাল শাখার রান্নাঘরে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের পর ইব্রাহিমের শরীরে আগুন ধরে যায়। গুরুতর দগ্ধ অবস্থায় তাঁকে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৮ অক্টোবর রাত ৮টায় চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। ইব্রাহিমের বাড়ি বাগেরহাটের সোনারহাট এলাকায়।
এ ঘটনায় পরিবারের পক্ষ থেকে বংশাল থানায় মামলা করা হয়েছে। তবে স্বজনদের অভিযোগ, ঘটনার পর ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট শাখা ব্যবস্থাপক তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিস্তারিত তথ্য জানাননি। উল্টো মামলা করার উদ্যোগ নিলে ব্যবস্থাপকসহ কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী তাঁদের নিরুৎসাহিত করার চেষ্টা করেন বলে দাবি পরিবারের।
ইব্রাহিমের মৃত্যুর মাত্র দুই দিন আগে সহকর্মী কালামের সঙ্গে তাঁর বিরোধ ও মারামারির ঘটনা ঘটেছিল বলে জানিয়েছেন স্বজনরা। তাঁদের দাবি, ওই সময় ইব্রাহিমকে চেয়ার দিয়ে মারধর করা হয়। আগের এই বিরোধের সঙ্গে পরবর্তী মৃত্যুর কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা এখনো তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হয়নি।
নিহতের ছেলে মো. বায়জিদ শেখের দাবি, ব্যাংকের রান্নাঘরে স্থাপিত সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ এখনো তাঁদের দেখানো হয়নি। বিস্ফোরণের আগে ও পরে সেখানে কী ঘটেছিল, তা জানার জন্য ফুটেজ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন তিনি। এ কারণে ফুটেজ সংরক্ষণ এবং তা মুছে ফেলা বা নষ্ট হওয়া ঠেকাতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
ঘটনাস্থলের কিছু আলামত নষ্ট কিংবা মুছে ফেলা হয়ে থাকতে পারে বলেও অভিযোগ করেছে পরিবার। এ ক্ষেত্রে ব্যাংকের শাখা ব্যবস্থাপক বা অন্য কোনো সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ভূমিকা ছিল কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন স্বজনরা।
পরিবারের মতে, ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট হওয়া জরুরি। গ্যাস সিলিন্ডার কীভাবে বিস্ফোরিত হলো, ঘটনার সময় রান্নাঘরে কারা উপস্থিত ছিলেন, ইব্রাহিম সেখানে কেন গিয়েছিলেন এবং বিস্ফোরণের আগে কারও সঙ্গে তাঁর কোনো বিরোধ হয়েছিল কি না-এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্তে বেরিয়ে আসা প্রয়োজন। পাশাপাশি মামলা করতে নিরুৎসাহিত করার অভিযোগ এবং আলামত নষ্টের আশঙ্কাও তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
পরিবারের ভাষ্য, মামলা দায়েরের পর বংশাল থানা থেকে তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে তাঁদের কিছু জানানো হয়নি। তবে পুলিশ জানিয়েছে, আইনানুগ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে মামলার পরবর্তী কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে বেসিক ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আবু মো. মোফাজ্জেল বলেন, মৃতের পরিবারের সদস্যরা সোমবার ব্যাংকে এসেছিলেন। বিষয়টি দেখভালের দায়িত্ব ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তা গোলাম সাঈদ খানকে দেওয়া হয়েছে। ইব্রাহিমের মৃত্যুর সঙ্গে মাদক-সংক্রান্ত কোনো বিষয় জড়িত থাকার তথ্য তাঁদের জানা নেই বলেও জানান তিনি। তাঁর ভাষ্য, ঘটনাটি বিশেষভাবে তদন্ত করা হবে।
ব্যাংকের রান্নাঘরে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা থাকার পরও আগুন লাগার কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে ভারপ্রাপ্ত এমডি বলেন, সেখানে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা রয়েছে বলে তিনি জানেন। তারপরও কী কারণে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে, তা তদন্ত করে দেখা হবে।
বংশাল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আশিক ইকবাল জানান, ইব্রাহিমের মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। তবে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন এখনো পুলিশের হাতে পৌঁছায়নি।
ইব্রাহিমের পরিবার জানিয়েছে, তারা তদন্তের আগেই কাউকে দায়ী করতে চায় না। তাদের প্রত্যাশা, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণ করা হবে এবং কারও অবহেলা, গাফিলতি কিংবা অপরাধমূলক সংশ্লিষ্টতা থাকলে তা শনাক্ত হবে। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
আপনার মতামত লিখুন :