Tathyojora.news পোল্ট্রিবিজ্ঞানের জীবন্ত পাঠ বাংলাদেশের আধুনিক পোল্ট্রি শিল্পের ভেতরে একদিন - Tathyojora.news

পোল্ট্রিবিজ্ঞানের জীবন্ত পাঠ বাংলাদেশের আধুনিক পোল্ট্রি শিল্পের ভেতরে একদিন


নিজস্ব প্রতিবেদক মে ৮, ২০২৬, ৪:২৭ অপরাহ্ণ
পোল্ট্রিবিজ্ঞানের জীবন্ত পাঠ বাংলাদেশের আধুনিক পোল্ট্রি শিল্পের ভেতরে একদিন

শিল্প পরিদর্শন প্রতিবেদন | কাপাসিয়া, গাজীপুর

বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল। সেদিন শ্রেণিকক্ষে নয়, শিক্ষার্থীদের পাঠ চলেছে বাস্তব শিল্প প্রতিষ্ঠানে। ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব স্টুডেন্টস ইন এগ্রিকালচারাল অ্যান্ড রিলেটেড সায়েন্সেস (IAAS) বাংলাদেশ, আইইউবিএটি শাখার উদ্যোগে ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড টেকনোলজি (IUBAT)-এর কৃষি অনুষদের প্রায় ৫৫ জন শিক্ষার্থী অংশ নেন একটি শিল্প পরিদর্শনে।

গন্তব্য ছিল গাজীপুরের কাপাসিয়ায় অবস্থিত ডায়মন্ড এগ লিমিটেড ও ডায়মন্ড অ্যাগ্রো অ্যান্ড গ্রেইনস লিমিটেড—বাংলাদেশের প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক পোল্ট্রি শিল্পের অন্যতম পরিচিত প্রতিষ্ঠান।

দলের একাডেমিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন ড. মো. আব্দুস সবুর তালুকদার, সহকারী অধ্যাপক, কলেজ অব এগ্রিকালচারাল সায়েন্সেস, আইইউবিএটি এবং প্রধান সমন্বয়ক, IAAS বাংলাদেশ, আইইউবিএটি।

যেখানে প্রতিদিন সংগ্রহ হয় ১০ লাখ ডিম:

প্রতিষ্ঠানে পৌঁছানোর পর শিক্ষার্থীদের স্বাগত জানান অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড সেলস ম্যানেজার মনজুরুল মনজু। তিনি জানান, প্রতিষ্ঠানটিতে প্রতিদিন প্রায় ১০ লাখ ডিম সংগ্রহ করা হয়, যা সর্বোচ্চ ১৮ থেকে ২০ লাখ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।

ডিম সংগ্রহ প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয়। নয়টি উৎপাদন ঘর থেকে কনভেয়র বেল্টের মাধ্যমে ডিম সরাসরি সংরক্ষণাগারে পৌঁছে যায়, যেখানে মানুষের হাতের স্পর্শ প্রায় লাগে না।

“ফিডিং থেকে শুরু করে উৎপাদন ঘর থেকে স্টোরে পৌঁছানো পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটাই স্বয়ংক্রিয়। শুধু ডিম গ্রেডিংয়ের কাজ এখনো মানুষের মাধ্যমে করা হয়।”
— মনজুরুল মনজু, ম্যানেজার, অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড সেলস

ডিমগুলো আকার, ওজন ও মুরগির বয়স অনুযায়ী গ্রেড করা হয়। সাধারণত ৬০ গ্রাম ওজনের ডিম বাজারজাত করা হলেও ৮০–৯০ গ্রাম ওজনের ডাবল কুসুমের ডিমও উৎপাদিত হয়।

প্রতিষ্ঠানটির এগ হাউস ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের বিস্তারিত ধারণা দেন ম্যানেজার মোহাম্মদ জামিরুল ইসলাম এবং সিনিয়র সহকারী মহাব্যবস্থাপক সোহেল রানা বাবু।

হ্যাচারি: যেখানে এক ডিগ্রি তাপমাত্রাও গুরুত্বপূর্ণ:

হ্যাচারি পরিদর্শনের আগে শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যবিধি মেনে টিকা গ্রহণ করতে হয়। এতে বোঝা যায়, পুরো ব্যবস্থাপনায় জৈব নিরাপত্তাকে কতটা গুরুত্ব দেওয়া হয়।

ডায়মন্ড চিকস লিমিটেডের উপমহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ গোলাম কবির শিক্ষার্থীদের হ্যাচারির বিভিন্ন ধাপ হাতে-কলমে দেখান।

প্রথমে ডিম রাখা হয় ২০–২২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার রিসিভার সেকশনে। পরে কোল্ড রুমে তাপমাত্রা কমিয়ে ১৮–২০ ডিগ্রিতে আনা হয়, যাতে ভ্রূণের বিকাশ নিয়ন্ত্রিত থাকে।

ইনকিউবেশন ইউনিটে তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও বায়ু চলাচল সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়। প্রতিটি ট্রলিতে প্রায় সাড়ে চার হাজার ডিম রাখা হয়।

১৮ দিন পর ক্যান্ডেলিং পদ্ধতিতে ডিমের ভেতরে ভ্রূণের অবস্থা পরীক্ষা করা হয়। এরপর জীবাণুমুক্তকরণ ও হ্যাচিং প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।

ফোটার পর ছানাগুলোকে আলাদা করা হয় এবং রোগ প্রতিরোধে প্রাথমিক টিকাও দেওয়া হয়।

ফিড ইউনিট: ভুট্টা থেকে তৈরি পুষ্টির ভিত্তি:

দুপুরের পর শিক্ষার্থীরা পরিদর্শন করেন ডায়মন্ড অ্যাগ্রো লিমিটেডের ফিড উৎপাদন ইউনিট।

ফিড তৈরির প্রধান কাঁচামাল ভুট্টা। এছাড়া বিভিন্ন ভিটামিন, খনিজ লবণ ও পুষ্টি উপাদান নির্দিষ্ট অনুপাতে মিশিয়ে প্রস্তুত করা হয় পোল্ট্রি ফিড।

কারখানার পুরো প্রক্রিয়াটি স্বয়ংক্রিয়। কাঁচামাল পরিষ্কার, বাছাই, মিশ্রণ, প্রসেসিং ও জীবাণুমুক্তকরণ—সব ধাপই মেশিননির্ভর।

সরকারি মহাব্যবস্থাপক মো. আবু সাঈদ শিক্ষার্থীদের পুরো উৎপাদন প্রক্রিয়া ঘুরিয়ে দেখান এবং প্রযুক্তিগত বিষয়গুলো ব্যাখ্যা করেন।

প্রতিদিন এই ইউনিটে ১২০ থেকে ১৫০ টন ফিড উৎপাদিত হয় বলে জানানো হয়।

বাস্তব অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ শিক্ষার্থীরা:

দিনব্যাপী এই শিল্প পরিদর্শনে শিক্ষার্থীরা আধুনিক পোল্ট্রি শিল্পের উৎপাদনব্যবস্থা, জৈব নিরাপত্তা, ইনকিউবেশন প্রযুক্তি ও ফিড ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করেন।

পরিদর্শন শেষে অংশগ্রহণকারীরা জানান, পাঠ্যবইয়ের বাইরেও বাস্তব শিল্পকারখানায় সরাসরি শেখার অভিজ্ঞতা তাদের ভবিষ্যৎ শিক্ষাজীবন ও পেশাগত প্রস্তুতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

দলের পক্ষ থেকে ডায়মন্ড এগ লিমিটেড ও সংশ্লিষ্ট সকল কর্মকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়।