
বাংলাদেশ পুলিশের গুরুত্বপূর্ণ একটি ইউনিট হলো নিরস্ত্র পুলিশ সার্জেন্টরা, যাদের অনেকেই পুলিশের ‘দর্পণ’ হিসেবে উল্লেখ করেন। রাজপথে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা, অপরাধ দমন এবং সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তারা প্রতিদিন সম্মুখ সারিতে দায়িত্ব পালন করলেও নিয়মিত ফৌজদারি মামলার তদন্তের দায়িত্ব থেকে তারা প্রায়শই বঞ্চিত থাকছেন।
বাস্তবে সড়ক দুর্ঘটনা, চুরি, ছিনতাই কিংবা চোরাচালানের মতো ঘটনার ক্ষেত্রে সার্জেন্টরাই অধিকাংশ সময় ঘটনাস্থলে প্রথম উপস্থিত হন। ফলে প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ ও পরিস্থিতি মোকাবিলায় তাদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পুলিশ রেগুলেশন বেঙ্গল (PRB) বিধি ৭৩৯(২) এবং ২০১৬ সালের সরকারি গেজেট অনুযায়ী, পুলিশ সার্জেন্টরা বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমি, সারদায় সাব-ইন্সপেক্টরদের সমমানের সিলেবাসে প্রায় এক বছর মেয়াদি কঠোর প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেন। এই প্রশিক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে মামলার তদন্ত প্রক্রিয়া, আইনগত জ্ঞান এবং ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জন অন্তর্ভুক্ত থাকে। প্রশিক্ষণ সফলভাবে সম্পন্ন করার পর তারা সাব-ইন্সপেক্টরের সমমর্যাদায় পুলিশ বাহিনীতে যোগ দেন।
সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ অনুযায়ী ৪৩, ৬৬, ৭২, ৭৫, ৮৪, ৮৭, ৮৯, ৯২ ও ৯৫ ধারায় সংঘটিত বিভিন্ন অপরাধে সার্জেন্টরা তদন্ত ও যাচাই-বাছাই করে জরিমানা আরোপ করে থাকেন। একই আইনের ১১০ ধারায় তাদের বিনা পরোয়ানায় অপরাধী আটক করার ক্ষমতাও দেওয়া হয়েছে, যা অনেক ক্ষেত্রে নিয়মিত ফৌজদারি মামলার প্রক্রিয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
বিশেষ করে সড়ক দুর্ঘটনা সংক্রান্ত আইন-২০১৮ সালের ১০৫ ধারার ঘটনায় তদন্ত পরিচালনার ক্ষেত্রে সার্জেন্টদের জন্য কোনো আইনি বাধা নেই বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। কারণ একই আইনের ১২০ ধারায় সার্জেন্ট ও সাব-ইন্সপেক্টর-উভয়কেই আইন প্রয়োগকারী কর্মকর্তা হিসেবে ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে। আদালতে সার্জেন্টদের প্রস্তুত করা সিজার লিস্ট এবং সুরতহাল রিপোর্টও দীর্ঘদিন ধরে গ্রহণযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।
পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের নির্দেশনায় ট্রাফিক ড্রাইভিং স্কুল (TDS), ঢাকা থেকে অনেক সার্জেন্ট ‘সায়েন্টিফিক ইনভেস্টিগেশন ফর রোড ট্রাফিক এক্সিডেন্ট’ শীর্ষক বিশেষ প্রশিক্ষণ কোর্সও সম্পন্ন করেছেন। এছাড়া অতীতের বিভিন্ন প্রশাসনিক নির্দেশনা-যেমন ২০০৬ সালের ডিএমপি অধ্যাদেশ এবং ১২ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে ডিএমপি কমিশনারের জারি করা আদেশ-পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সড়ক দুর্ঘটনার তদন্ত ট্রাফিক বিভাগের মাধ্যমেই সম্পন্ন করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।
ফৌজদারি কার্যবিধির ৪(১)ঠ ধারা অনুযায়ী তদন্ত বলতে বোঝায় পুলিশ কর্মকর্তার মাধ্যমে সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহের প্রক্রিয়া। অন্যদিকে পুলিশ আইন-১৮৬১ এর ২৩(৬) ধারা অনুসারে অপরাধের ঘটনা অনুসন্ধান, অভিযুক্তকে গ্রেফতার এবং আদালতে প্রেরণ করা পুলিশের দায়িত্বের মধ্যেই তদন্ত কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত।
সার্জেন্ট ও সাব-ইন্সপেক্টর একই পদমর্যাদার কর্মকর্তা হওয়ায় পিআরবি ২৫৮ বিধি অনুযায়ী থানার অফিসার ইনচার্জ চাইলে যেকোনো সার্জেন্টকে তদন্তের দায়িত্ব দিতে পারেন। আইনের কোথাও সার্জেন্টদের তদন্ত পরিচালনায় নিষেধাজ্ঞা নেই; বরং সাব-ইন্সপেক্টরের নিচের পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের তদন্ত না দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সার্জেন্টদের তদন্ত দায়িত্ব প্রদান করা হলে সড়কে সংঘটিত অপরাধ ও দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ দ্রুত উদ্ঘাটন করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে থানা পুলিশের ওপর মামলার অতিরিক্ত চাপও কমবে। এতে প্রায় ২২০০ বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতক ডিগ্রিধারী দক্ষ সার্জেন্টদের মেধা ও প্রশিক্ষণ রাষ্ট্রের প্রয়োজনে আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যাবে।
পুলিশ আইন-১৮৬১ এর ১২ ধারা অনুযায়ী পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চাইলে একটি পরিপত্র জারির মাধ্যমে এই দায়িত্ব বণ্টনের ব্যবস্থা করতে পারেন। তাই সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, সার্বিক আইনি দিক বিবেচনা করে এ বিষয়ে দ্রুত প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।
আপনার মতামত লিখুন :