
মতপার্থক্যের মাঝেও প্রয়োজন মানবিকতা ও সহনশীলতার ভারসাম্য
গত বছর জানুয়ারিতে সিলেটের জাহিদ হাসান (২৫) নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে গিয়ে জানান, উভকামী পরিচয়ের কারণে তাকে নিজ গ্রাম থেকে বের করে দেওয়া হয়। পরিবার থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে বর্তমানে তিনি একটি হোটেলে কাজ করার পাশাপাশি পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছেন, তবে নিজের পরিচয় গোপন রেখেই বেঁচে থাকতে হচ্ছে। একইভাবে নোয়াখালির ফাহিম (২৬) (ছদ্মনাম) জানান, সমকামী হওয়ার কারণে পরিবার ও সমাজের চাপে তাকে বাড়ি ছাড়তে হয়েছে। বর্তমানে ঢাকায় পরিচয় গোপন রেখে কাজ করছেন তিনি।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ইসলামসহ দেশের প্রধান ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে সমকামিতা সাধারণত হারাম বা নিষিদ্ধ হিসেবে বিবেচিত। ফলে এই বিষয়ে সমাজে নেতিবাচক মনোভাব বিদ্যমান, যা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জন্য পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তোলে।
আইনগত দিক থেকেও বিষয়টি সংবেদনশীল। দেশের দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারায় ‘প্রকৃতির নিয়মবিরুদ্ধ’ যৌন সম্পর্ককে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ ধরনের আইন পরিবর্তন হয়েছে, বাংলাদেশে এটি এখনো বলবৎ রয়েছে। এর ফলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আইনি ঝুঁকি ও সামাজিক চাপ-দুটোর মধ্যেই অবস্থান করেন।
মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা রয়েছে। আধুনিক মনোবিজ্ঞান অনুযায়ী সমকামিতা কোনো মানসিক রোগ হিসেবে বিবেচিত হয় না; বরং এটি মানুষের যৌন প্রবণতার একটি স্বীকৃত ভিন্নতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়। ফলে এটিকে চিকিৎসার মাধ্যমে পরিবর্তনযোগ্য রোগ হিসেবে দেখা বৈজ্ঞানিকভাবে সমর্থিত নয়।
তবে বাস্তবতা হলো, সামাজিক ও ধর্মীয় কাঠামোর কারণে অনেকেই মানসিক দ্বন্দ্বে ভোগেন। এই ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞরা কিছু দিকনির্দেশনার কথা বলেন- মানসিক সহায়তার জন্য কাউন্সেলিং নেওয়া, পারিবারিক সংলাপের মাধ্যমে বোঝাপড়া তৈরির চেষ্টা করা, ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও মূল্যবোধ অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করা এবং সর্বোপরি নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
সাংস্কৃতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও আমাদের সমাজে নারী-পুরুষভিত্তিক পরিচয়ই প্রধান হিসেবে বিবেচিত। ফলে এর বাইরে থাকা যেকোনো পরিচয় অনেক সময় গ্রহণযোগ্যতা পায় না। এতে করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ওপর মানসিক চাপ তৈরি হয় এবং তারা নিজেদের পরিচয় গোপন রাখতে বাধ্য হন।
বিভিন্ন পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য, বাসা ভাড়া পেতে সমস্যা এবং সামাজিকভাবে বুলিং-এসব চ্যালেঞ্জ অনেকের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়ায়। এসব কারণে মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের জটিল সামাজিক বাস্তবতায় ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে দেশের প্রচলিত আইন, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধকে সম্মান করা, অন্যদিকে সকল নাগরিকের নিরাপত্তা ও মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
বিষয়টি নিয়ে মতপার্থক্য থাকলেও পারস্পরিক সম্মান, সহনশীলতা এবং মানবিক আচরণ বজায় রাখা-একটি সুস্থ সমাজ গঠনের জন্য অপরিহার্য।
লেখক: মো. ইব্রাহিম হৃদয়
আপনার মতামত লিখুন :